লিখেছেন : ধীমান ওয়াংঝা
🌺 সুপ্রিয় বন্ধুগণ, মন ভালো নেই। করোনাভীতি, পাহাড়ের সাম্প্রতিকতম হত্যাকাণ্ড, চারপাশের অরাজক পরিস্থিতি সবকিছুই আসলে মনকে বিষিয়ে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। তাই বেশ কষ্টকর হলেও একটু প্রশান্তির জন্য মহামানব গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে আরেক মহামানব স্বামী বিবেকানন্দের লেখা দীর্ঘ কবিতাটি সবার জন্য কম্পোজ করলাম। লেখার ফাঁকে ভাবছিলাম, তথাগত বুদ্ধ এবং স্বামীজি কি আসলেই জানতেন আমাদের জুমপাহাড়ও একদিন দিকভ্রষ্ট, পথভ্রষ্ট হয়ে অকুল পাথারে অন্ধের মতো পথ হাতড়াবে? তথাগত বুদ্ধের মৈত্রীময় শিক্ষা ও জীবনদর্শনকে অবহেলা, অবমানিত করে বিজাতীয় তক্যা-থুগুরি-ড্রাগন-মাতাল ফিরিঙ্গির রাজনৈতিক আদর্শ বা দর্শনকে অনুসরণ করতে গিয়ে জুম্মরা একদিন স্বজাতির রক্তে পবিত্র জুমভূমিকে রঞ্জিত করবে?
🌺 বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায়, রক্তপাত বন্ধে এবং আধুনিককালের কূটনীতিতে তথাগত বুদ্ধের চিন্তাধারা এবং অহিংসার আদর্শ যে কতোটা প্রাসঙ্গিক তা স্বামীজির এই কবিতার বয়ানে এবং সাম্প্রতিক চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজির তৎপরতা ও ভাষণ থেকে অনুধাবন করা যাবে। মোদীজি এবার লাদাখ সীমান্ত পরিদর্শনে গিয়ে সেনাদের উদ্দেশ্যে তথাগত বুদ্ধকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন - সাহস, আত্মবিশ্বাস, ন্যায়ানুগ আত্মরক্ষা, সক্ষমতা ও স্বাধীনতা শান্তির পূর্বশর্ত। পরাধীনতা মানেই অশান্তি। তাই যে কোনো মূল্যেই মায়ের/মাতৃভূমির সম্ভ্রম, স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বছর কয়েক আগে বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, যেখানে বুদ্ধ সেখানে যুদ্ধ থাকতে পারে না। আধুনিক চীনের জনক মাও জেদংও শৈশবে তাঁর মায়ের সাথে স্বগৃহে এবং মন্দিরে গিয়ে নিবিষ্ট চিত্তে বুদ্ধের পদতলে বসে প্রার্থনা ও ধ্যান করতেন। তাই স্বাভাবিকভাবে মাওয়ের মানস-কাঠামোতে, চিন্তায় বুদ্ধ কোন না কোনোভাবে উপস্থিত আছেন/ছিলেন, তা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। কারণ, শৈশবের মধুর স্মৃতিগুলো মানুষ কখনো ভুলতে পারে না। চীনের বর্তমান নেতৃত্বও তাই সচেতন কিংবা অবচেতন মনে হলেও তথাগত বুদ্ধের অহিংসার আদর্শকে লালন করেন এবং তথাগতের আদর্শকে অবমানিত করে চীনের প্রায় আট হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতাকে মহিমান্বিত করা যাবে না, সেটি তাঁরা আলবৎ জানেন। হয়তোবা সেকারণে মোদীজিও এবার যুতসইভাবে বুদ্ধের অহিংসার আদর্শকে চলমান সীমান্ত সংঘাত নিরসনে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বুদ্ধের দেশপ্রেমের আদর্শের কথা বলে একদিকে তিনি নিজ দেশের সৈনিকদের মনোবল চাঙ্গা করেছেন, অন্যদিকে বুদ্ধের আদর্শ পরিপন্থী হিংসাত্বক আগ্রাসীর তকমা লাগিয়ে দিয়ে চীনকেও নৈতিকভাবে দুর্বল এবং অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। ফলে তথাগত বুদ্ধের অহিংসা-প্রভাবিত কূটনীতির সুফল সাথে সাথেই মিলেছে। চীন-ভারতের সীমান্ত উত্তেজনা আপাতত প্রশমিত হয়েছে। উভয় দেশের সেনারা বিতর্কিত সীমান্ত এলাকা (এলএসি) থেকে বহুদূরে সরে গেছেন। তাই বলি, বর্তমান সহিংস বিশ্ব-ব্যবস্থায়, চলমান কুটিল-জটিল রাজনীতি ও কূটনীতির প্রেক্ষিতে বুদ্ধ তথাগতের অহিংসা-মৈত্রী-ক্ষমা-করুণা-মুদিতার চেতনা, আদর্শ ও শিক্ষা এখনো প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু আমরা অঘা জুম্মরা নিজেদের হাতে মজুদ এই মহামূল্যবান রত্নটিকে কখনই চিনতে পারলাম না! ফলে পাহাড়ে রক্তপাতও থামছে না।
🌺 দুঃখজনক সত্য হলো, পাহাড়ের রাজনীতিবিদেরা বুদ্ধের অহিংসার আদর্শ এবং শিক্ষাকেও অন্যান্য ধর্মমতগুলোর মতো একটি গতানুগতিক ধর্ম [আফিম, নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস ইত্যাদি] হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বেশ অবমানিত এবং সামাজিক, রাজনৈতিক সুস্থিতি প্রতিষ্ঠায় অপ্রয়োজনীয় বলে গণ্য করেন। কিন্তু তাঁরা আসলে এই মহান ধর্মটির মৌলিক কোনো গ্রন্থ আদৌ পড়ে দেখেছেন কিনা, সে বিষয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। আমি মনে করি, সাম্প্রতিককালের চীন-ভারত সীমান্ত সমস্যাটির মতো আমাদের জুম্মদের প্রকৃত মুক্তিও এই বিশেষ ধর্মটির অহিংস আদর্শের ছায়াতলেই নিহিত রয়েছে। দলগত জীবনে মানুষ নিজেকে যতো বীর, সহিংস অঙ্গুলিমালই ভাবুক না কেনো একদণ্ড শান্তির জন্য একদিন কিন্তু তাকে নিজের অন্তরাত্মার কাছেই ফিরতে হয়। তখন অতীতের সব অন্যায়, অপকর্মের জন্য প্রবল অনুশোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর সেক্ষেত্রে বুদ্ধ তথাগতের অহিংসার মন্ত্রই আলোকবর্তিকা হয়ে পথভ্রষ্টদেরকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে। আমরা আশা করতে পারি, একদিন যুযুধান সব দলের সদস্যদের সমুদয় ক্ষোভ প্রশমিত হবে। তাঁরা একসাথে, একজায়গায় বসে আবারো আগের মতো আম, বরই, উলু, গঙ্গত্যা হরবুওর ঝালে নিমগ্ন হয়ে পাহাড়ের সেই চিরায়ত সুখী জীবনকে উপভোগ করবেন। একমাত্র এমনটি ঘটলেই জুমপাহাড়ের মানুষ দেখতে পাবে শান্তির, সমৃদ্ধির, প্রশান্তির এক নতুন সূর্যোদয়। স্বামীজির কবিতায় যেন তারই ইঙ্গিত বিধৃত। শুধুমাত্র এই কবিতার মর্মবাণীকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারলেই আমাদের অর্ধেক অধিকার অতি সহজেই অর্জিত হবে বলে মনে করি। বন্ধুগণ, প্লিজ কবিতাটি পড়ে দেখুন।
নমো সম্বুদ্ধায়
🙏🙏🙏🙏
স্বামী বিবেকানন্দ
[১]
🍁🍁 বুদ্ধ আমার ইষ্ট, আমার ঈশ্বর।
তিনি এসেছিলেন আমার ঘরে, জীবনে আমার, একেবারে বাল্যকালে।
তখন স্কুলে পড়ি, ধ্যান করছি রুদ্ধ ঘরে,
অকস্মাৎ আবির্ভূত জ্যোতির্ময় পুরুষ, সম্মুখে;
মুখে অপূর্ব আলোক, মুণ্ডিত মস্তক, দণ্ড-কমণ্ডুল হস্তে প্রশান্ত সন্ন্যাসী
ভাষাময় নয়নে তাকিয়ে আমার দিকে, যেন কিছু বলবেন।
অভিভূত আমি, প্রণাম করেছি সাষ্টাঙ্গে, কিন্তু ভয় পেয়েছি,
দ্বার খুলে বেরিয়ে এসেছি নির্বোধের মতো,
শোনা হয়নি তাঁর কথা।
জানি তবু জানি – প্রভু বুদ্ধই এসেছিলেন আমার কাছে।
🍁🍁 তারপর একদিন বুদ্ধগয়ায় ধ্যানে বসেছি বোধিবৃক্ষতলে,
আর শিউরে উঠেছি – এও কি সম্ভব!-
যে-বায়ুতে নিশ্বাস নিয়েছিলেন তিনি –
তাতেই শ্বাস নিচ্ছি আমি।
যে মাটিতে বিচরণ করেছিলেন –
তাতেই অবস্থিত আমিও!
🍁🍁 বুদ্ধ।
তিনি সেই একমাত্র যাঁতে আবির্ভূত এবং বিঘোষিত এই বার্তা –
‘মৃত্যু মহা অভিশাপ–অভিশাপ এ-জীবন।
মৃত্যু ও জীবনের লয় যে নির্বাণে –
তাই হোক মানবের ধ্রুব আশ্রয়।’
ও নমো ভগবতে সম্বুদ্ধায়।
[২]
🍁🍁 জগৎ দেখেনি তার মতো সংস্কারক
যিনি বলেছেন স্থির কণ্ঠেঃ
কিছু শুনেছ বলেই তাকে বিশ্বাস করো না;
বংশানুক্রমে কোনো মত পেয়েছ বলেই তাকে বিশ্বাস করো না;
প্রাচীন কোনো ঋষির বাক্য বলেই তাকে বিশ্বাস করো না;
বিচার করো, বিশ্লেষণ করো, দ্যাখো যুক্তির সঙ্গে মেলে কিনা;
দ্যাখো তা সকলের কল্যাণকর কিনা,
যদি হয়, তবেই গ্রহণ করো,
আর জীবন যাপন করো সেই মতো।
🍁🍁 তার্কিক ব্রাহ্মণকে বুদ্ধ প্রশ্ন করলেন –
আপনারা ব্রহ্মকে দেখেছেন?
- না
আপনাদের পিতা ব্রহ্মকে দেখেছেন?
- মনে হয় না।
আপনাদের পিতামহ ব্রহ্মকে দেখেছেন?
- জানিনা।
হে বন্ধুগণ। যাঁকে না দেখেছেন আপনি,
না দেখেছেন আপনার পিতা বা পিতামহ,
সেই অদৃশ্যের দ্বারা দাবিয়ে রাখতে চান অন্যদের –
কি আশ্চর্য!
🍁🍁 ঈশ্বরের স্বরূপ নিয়ে ব্রাহ্মণদের মধ্যে চলেছে তুমুল তর্ক,
কোলাহল, বিষাক্ত বাক্য-বিনিময়।
বুদ্ধ শান্তভাবে সব শুনলেন, পরে বললেন,
আপনাদের শাস্ত্র কি বলেছে – ঈশ্বর ক্রোধী?
- না, বলেনি।
আপনাদের শাস্ত্র কি বলেছে – ঈশ্বর অপবিত্র?
- না, অবশ্যই বলেনি।
আপনাদের শাস্ত্র এ-বিষয়ে কী বলেছে?
- শাস্ত্র বলেছে - ঈশ্বর পবিত্র, ঈশ্বর প্রেমময়, ঈশ্বর মঙ্গলময়।
স্নিগ্ধ হাসিতে বুদ্ধ বললেন, হে বন্ধুগণ!-
তাহলে কেন আপনারা চেষ্টা করেন না পবিত্র ও মঙ্গলময় হতে –
যাতে ঈশ্বরকে জানতে পারেন?
🍁🍁 ধর্মে অলৌকিকতার প্রচণ্ড বিরোধী বুদ্ধের কাছে শিষ্যরা সোৎসাহে বললেন –
এক অলৌকিক ক্রিয়াকারীর কথা।
সে লোকটি নাকি শূন্য থেকে মৃৎভাণ্ড নামাতে পারে।
তেমন একটি পাত্র বুদ্ধকে দেখানোও হল।
লাথি মেরে সেটি ভেঙে বুদ্ধ বললেন –
কদাপি অলৌকিকতার উপরে ধর্মকে দাঁড় করাবে না।
অনুসন্ধান করো বিশুদ্ধ সত্যের,
অগ্রসর হও আত্মজ্যোতির আলোকে।
সত্যের জন্য বুদ্ধের নির্ভয় সন্ধান,
প্রতিটি প্রাণীর জন্য অপূর্ব প্রেম,
জগতে অনন্য।
ধর্মজগতের মহাসেনাপতি বুদ্ধ,
সিংহাসন অধিকার করেছিলেন
অপরকে দান করার জন্যই।
[৩]
🍁🍁 বুদ্ধ প্রেরণ করতেন প্রেমপ্রবাহ –
উত্তরে ও দক্ষিণে, পূর্বে ও পশ্চিমে, ঊর্ধ্বে ও নিম্নে –
যতক্ষণ না পূর্ণ হয়ে যায় সমগ্র জগৎ সে অনন্ত স্রোতে।
সম্মুখে রয়েছে আলোকিত বিশ্বজগৎ
এ বিশ্বের সবকিছু আমাদের,
বাহু প্রসারিত করে আলিঙ্গন করো জগৎকে।
মহারণ্যে বুদ্ধের ধ্যান আত্মমুক্তির জন্য নয়।
জগৎ জ্বলছে-নির্গমনের পথ চাই-
বাঁচার জন্য।
জগতে এত দুঃখ কেন-কেন-
সেই যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত তিনি।
অনুসরণ করো তাঁকে – বুদ্ধত্বলাভের পূর্বে যিনি
পাঁচশতবার জন্মেছেন ও মৃত্যুবরণ করেছেন –
সেই শ্রীবুদ্ধকে।
[৪]
🍁🍁 বুদ্ধের ধর্ম দ্রুত ছড়িয়েছিল তাঁর দর্শনের জন্য নয়,
বুদ্ধের বিস্তারের কারণ তাঁর অপূর্ব প্রেম।
মানব-ইতিহাসে সেই প্রথম একটি বিশাল হৃদয় করুণায় বিগলিত,
সিক্ত করেছিল সর্বপ্রাণীকে।
🍁🍁 ঈশ্বরকে ভালবেসেছে মানুষ কিন্তু ভুলেছে মনুষ্য-ভ্রাতাকে।
ঈশ্বরের জন্য প্রাণ দিয়েছে সে - নিয়েছেও প্রাণ –
ঈশ্বরেরই নামে।
বলি দিয়েছে নিজ সন্তানকে, লুণ্ঠন করেছে অন্য দেশ ও জাতিকে,
খুন করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে,
সিক্ত করেছে ধরিত্রী রক্তে শুধু রক্তে,
সবই ঈশ্বরের নামে - ঈশ্বরের নামে।
🍁🍁 বুদ্ধের শিক্ষাতে মানুষ প্রথম মুখ ফেরাল অপর ঈশ্বরের দিকে,
সে ঈশ্বর – মানুষ।
বুদ্ধের ভিতর থেকে উঠেছিল বিশুদ্ধ প্রেম আর জ্ঞানের ঢেউ,
তা ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল দেশের পর দেশ,
পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ – সর্বদিক-সর্বপ্রান্ত।
অসাম্যের বিরুদ্ধে চির সংগ্রামী,
জাতিভেদ খণ্ডনকারী,
🍁🍁 অধিকারবাদ নাশকারী,
সর্বপ্রাণীর সাম্যবিঘোষক,
লক্ষ-লক্ষ পদদলিতের পরিত্রাতা-
তিনি তথাগত-বুদ্ধ।
[৫]
🍁🍁 বুদ্ধের এই দারুণ বার্তাঃ
উন্মুল করো নিজ হৃদয়ের স্বার্থপরতা,
উন্মুল করো সকলই যা স্বার্থে ভোলায় মানুষকে।
স্ত্রী নয়-পুত্র নয়-পরিবার নয়, না-না-
আবদ্ধ হয়ো না সংসারে।
স্বার্থশূন্য হও! স্বার্থশূন্য হও!
অতন্দ্র বুদ্ধের বাণীঃ
তীব্রগতি কাল, নশ্বর জগৎ, দুঃখ সর্বস্ব যেখানে।
তোমার ঐ উত্তম খানা, সুন্দর বসন, আরামের বাস!
হে মোহনিদ্রিত নর নারী –
ভেবেছ কি কোটি-কোটি ক্ষুধাতুরের কথা যারা মৃত্যুপথযাত্রী
শুধু দুঃখ, শুধু দুঃখ – ভুলোনা এই মহাসত্য।
জগতে প্রবেশের মুখে শিশু কাঁদে,
সেই তার প্রথম উচ্চারণ।
কান্নাই সত্য জগতে-সকলে কাঁদছে-কাঁদবে।
এই জেনে ত্যাগ করো স্বার্থ।
🍁🍁 আচার্যদের মধ্যে বুদ্ধই সর্বাধিক শিখিয়েছেন
আত্মবিশ্বাসী হতে।
যেখানে স্বাধীনতা সেখানেই শান্তি – তিনি বলেছেন।
যেখানে অধীনতা সেখানেই দুঃখ – তিনি বলেছেন।
মানুষে রয়েছে অনন্ত শক্তি,
কেন সে কেবলই প্রার্থনা করবে ঈশ্বরের কাছে?
প্রতি শ্বাসে উপাসনা করছ তোমরা – একথা ভুলো না।
আমি তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি – এও উপাসনা।
তোমরা শুনছ - এও উপাসনা।
শরীর-মনের এমন মুহূর্ত কি সম্ভব যখন মানুষ
দিব্যশক্তিই প্রকাশলীলার অংশী নয়?
প্রার্থনা কি যাদুমন্ত্র যে শব্দ-উচ্চারণেই অলৌকিক ফল লাভ?
না-না-প্রত্যেককে শ্রমে ও ধর্মে পৌঁছতে হবে গভীরে,
অনন্ত শক্তির উৎসে
শ্রমই সর্বোচ্চ প্রার্থনা - বাক্য নয়।
কর্মের দ্বারা উপাসনা করো – নীরবে।
🍁🍁 প্রলোভন এসেছিল বুদ্ধের কাছে, হাতছানি দিয়ে বলেছিল,
ছেড়ে দাও সত্যের সন্ধান,
ফিরে যাও সংসারে, পুরনো জীবনে, জুয়াচুরি আর মিথ্যার জগতে,
ভ্রান্ত শব্দে চিহ্নিত করো সদবস্তুকে।
🍁🍁 প্রলোভনের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে সেই মহাকায় পুরুষ বলেছিলেন,
সত্যের সন্ধানে মৃত্যুও শ্রেয় – অজ্ঞানের জীবনের চেয়ে।
যুদ্ধক্ষেত্রে বিনাশও শ্রেয় – পরাভূত জীবনের চেয়ে।
শত্রু বা মিত্র, কেউ কখনো বলতে পারেনি
সর্বজনের হিত ছাড়া বুদ্ধ একটি নিশ্বাসও নিয়েছেন,
একটুকরো রুটিও খেয়েছেন।
কল্যাণের জন্যই তিনি কল্যাণকৃৎ।
প্রেমের জন্যই তিনি প্রেমিক।
🍁🍁 বুদ্ধের শিষ্যরা প্রশ্ন করলেন – আমরা সৎ হব কেন?
বুদ্ধ বললেন – তোমরা সদভাব পেয়েছ উত্তরাধিকারসূত্রে,
সদভাবের উত্তরাধিকার রেখে যাও পরবর্তীদের জন্য।
এসো আমরা চেষ্টা করি সমষ্টিগত সাধুতার বৃদ্ধির জন্য,
এসো আমরা সদাচরণ করি সদাচরণের জন্যই।
মানুষের দুঃখের জন্য মানুষ দায়ী,
মানুষের সদাচরণের প্রশংসা মানুষই পাবে।
সমুদ্রের ঢেউ নেমে যাবার সময়ে সঞ্চারিত করে যায়
পরবর্তী ঢেউয়ে উত্থানের শক্তি,
তেমনি এক আত্মা দিয়ে যায় নিজের শক্তি -
ভবিষ্যৎ আত্মায়।
[৬]
🍁🍁 হে পাশ্চাত্যবাসিগণ! তোমরা বলছ-
ক্রুশবিদ্ধ হলে বৃদ্ধি পেত বুদ্ধের মহিমা।
হায় – ঠিক!
রোমক নিষ্ঠুরতার হে পূজারীগণ!
তোমরা কেবলই চাও অসাধারণ কাণ্ড, এপিক গর্জন,
‘হেঁটমুণ্ডে অতলস্পর্শে গহ্বরে নিক্ষেপের’
মিল্টনী চীৎকার।
খ্রীষ্টকে পেরেক ঠুকে মারা হয়েছে, তিনি ককিয়ে কেঁদেছেন,
খুবই পছন্দ তোমাদের।
জীবনের সামান্য ঘটনার কবিত্ব তুচ্ছ তোমাদের কাছে,
আমাদের কাছে কিন্তু নয়।
অপূর্ব লাগে বুদ্ধের জীবনের ছোটখাটো ঘটনাগুলি।
যেমন ধরো না কেন –
মৃতপুত্র বুকে নিয়ে মা এসেছে কাঁদতে-কাঁদতে –
‘হে বুদ্ধ! হে প্রভু! জীবন দান করো পুত্রের,
সকলই সাধ্য তোমার।’
বুদ্ধ বললেন করুণা-কণ্ঠে,
‘মাতঃ! প্রাণভিক্ষা করছ পুত্রের?
তার আগে ভিক্ষা করে আনো এক মুঠা শ্বেত সরিষা,
এমন গৃহ থেকে যেখানে প্রবেশ করেনি মৃত্যু।’
‘শুধু এই? এত সামান্য? এখনই আনছি-’
ছুটে বেরিয়ে গেল জননী, সারাদিন ঘুরল দ্বারে-দ্বারে,
কিন্তু পেল না, কারণ মৃত্যু নেই এমন গৃহ নেই।
মৃত্যুস্রোতের কুলে দাঁড়িয়ে পুত্রহারা মা জেনেছিল –
জীবনের অনিবার্য সত্য –
মৃত্যু।
🍁🍁 আরও কাহিনী –
বুদ্ধ কাঁধে তুলে নিয়েছেন ছাগশিশুটিকে।
ছাগশিশুটি খুঁড়িয়ে হাঁটছিল যূপকাষ্ঠের দিকে –
বলির পশুদের সঙ্গে।
বুদ্ধ এসে দাঁড়ালেন রাজদ্বারে,
পুণ্যলোভাতুর নৃপতিকে বললেন,
হে মহারাজ! ছাগশিশুকে বলি দিলে যে পুণ্য
তারো চেয়ে বহুগুণ পুণ্য পাবে মানুষকে বলি দিলে।
আমি প্রস্তুত – ছাগশিশুটির স্থান নিতে।
🍁🍁 হেলায় রাজসম্পদ ত্যাগ করে বুদ্ধ নেমেছেন পথে –
এর নাটকীয় সৌন্দর্যে মুগ্ধ তোমরা; হে, পাশ্চাত্যবাসী!
ওটা কোনো বিরাট ব্যাপার নয় ভারতবর্ষে।
এক ক্ষুদ্র রাজার পুত্র গৌতম, কি-বা ঐশ্বর্য তাঁদের,
তাঁর মতো ত্যাগ অনেকেই করেছেন পূর্বে।
কিন্তু কোনো তুলনা নেই নির্বাণ পূর্ববর্তী ঘটনার,
সহজের অপূর্ব সৌন্দর্যে পূর্ণ সেগুলি।–
🍁🍁 রাত্রি গভীর, বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম
বুদ্ধ দাঁড়ালেন এসে এক গোপের কুটীরে
ছাঁচের নীচে দেওয়ালের গা ঘেঁষে।
ছাঁচ দিয়ে জল ঝরছে। বাতাসের ঝাপট।
জানলা দিয়ে গোপ চকিতে দেখল সন্ন্যাসীকে।
‘বা! বা! গেরুয়াধারী যে! থাকো ওখানে।
ওই তোমার ঠিক জায়গা।’
গান ধরল সে –
‘গোরু-বাছুর উঠেছে গোয়ালে, আগুনে তপ্ত ঘর,
নিরাপদ পত্নী আমার, সুখে নিদ্রিত সন্তানেরা,
সুতরাং মেঘগণ! আজ রাত্রে –
তোমরা বর্ষণ করো স্বচ্ছন্দে।’
বুদ্ধ উত্তর দিলেন –
‘আমার মন সংযত, ইন্দ্রিয় প্রত্যাহৃত,
হৃদয় দৃঢ় ও সুস্থির।
সুতরাং হে মেঘগণ! আজ রাত্রে –
তোমরা বর্ষণ করো স্বচ্ছন্দে।’
গোপ গাইল –
‘খেতের ফসল কাটা শেষ, খড় উঠেছে খামারে,
জলভরা নদী, মজবুত বাঁধানো পথ,
সুতরাং হে মেঘগণ! আজ রাত্রে –
তোমরা বর্ষণ করো স্বচ্ছন্দে।’
🍁🍁 গাইতে-গাইতেই লাগল গোপ,
উত্তর দিয়ে গেলেন বুদ্ধ একই ভাবে।
ক্রমে নম্র হয়ে এল গোপের কণ্ঠ,
নত হল সে বুদ্ধের চরণে,
অনুতপ্ত হৃদয়ে – শিষ্যত্বের জন্য।
🍁🍁 মৃত্যুতে মহীয়ান বুদ্ধ – জীবনের মতোই।
অন্ত্যজ জাতির এক মানুষ আহার্য দিল তাঁকে,
দুষ্ট উপাদানে, অশুচি পরিবেশে প্রস্তুত খাদ্য।
বুদ্ধ শিষ্যদের বললেন, তোমরা খেয়ো না এ জিনিস,
কিন্তু আমি তো পারব না প্রত্যাখ্যান করতে।
যাও, বলে এসো ঐ মানুষটিকে,
আমার সর্বোচ্চ সেবা সে করেছে,
আমাকে মুক্ত করেছে এই দেহের বন্ধন থেকে;
বুদ্ধ বিদায় নেবেন পৃথিবী থেকে,
বৃক্ষতলে বিছানো চীবর,
সিংহের ন্যায় দক্ষিণ পার্শ্বে আনন্দময় পুরুষ,
মৃত্যুর প্রতীক্ষায়।
🍁🍁 প্রিয় শিষ্য আনন্দ কাঁদছিলেন।
বুদ্ধ তিরস্কার করে বললেন,
জেনে রাখো, বুদ্ধ ব্যক্তিবিশেষ নন,
ওটি এক উচ্চ অবস্থা, যে-কেউ লাভ করতে পারে।
অন্য কাউকে অর্চনা নয় –
অত্তদীপো ভব।
সিংহ যেমন ভীত নয় শব্দে,
জালবদ্ধ নয় বায়ু, জললিপ্ত নয় পদ্মপত্র,
তেমনি একাকী বিচরণ করো গণ্ডারের মতো।
দৃষ্টি দিওনা পথের দিকে, গ্রাহ্য করো না কোনোকিছু,
অগ্রসর হও গণ্ডারের মতো একাকী।
🍁🍁 শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছে তথাগতের,
সকলে নীরব, রুদ্ধশ্বাস!
দূরাগত একজন সহসা ছুটে এল সেখানে,
উপদেশপ্রার্থী।
হবে না, সম্ভব নয় – শিষ্যরা ফেরালো তাকে।
বুদ্ধ থামালেন।
বুদ্ধ বললেন, ওকে আসতে দাও,
তথাগত সর্বদা প্রস্তুত।
সত্য – গভীরভাবে সত্য – এই কাহিনী।
আমি দেখেছি রামকৃষ্ণকে
অন্তিমক্ষণে একই কাজ করতে।
রামকৃষ্ণ সদা প্রস্তুত। 🙏🙏🙏
[নোটঃ স্বামীজির এই দীর্ঘ কবিতাটি শ্রী শঙ্করীপ্রসাদ বসু কর্তৃক সঙ্কলিত এবং শ্রী হেমেন্দু বিকাশ চৌধুরীর সম্পাদনায় কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘বুদ্ধ প্রণাম’ শীর্ষক সঙ্কলনগ্রন্থ থেকে সংগৃহীত]। 🍁🍁🍁🍁🌹🌹🌹🌹


No comments:
Post a Comment