![]() |
| মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা |
জোর করে বাঙালিত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা'র সংসদে দেওয়া প্রতিবাদী বক্তব্য
বাংলাদেশ গণপরিষদের বিতর্ক
মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ১৯৭২
বিষয় : সংবিধান-বিল বিবেচনা (দফাওয়ারী পাঠ)
(৬ অনুচ্ছে : নাগরিকত্বের উপর সংশোধনী প্রস্তাব)
===========**===========
১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গণপরিষদের বৈঠকে ঢাকা- ১২ আসনের সাংসদ আঃ রাজ্জাক ভূঁইয়া বলেন, 'মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমি প্রস্তাব করছি যে, "সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক :
"৬ । বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে; বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।"
(গণপরিষদ বিতর্ক : ১৯৭২)
গণপরিষদের এই বৈঠকে স্পিকার ছিলেন জনাব মুহম্মদুল্লাহ। রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবের উপর বক্তৃতা রাখতে গিয়ে সেই সময়ের তরুণ আওয়ামী লীগের নেতা, আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলি এবং সংবিধান প্রণয়ন মন্ত্রী ডঃ কামাল হোসেন বলেন,
'মাননীয় স্পিকার সাহেব, এই সংশোধনী আমি গ্রহনযোগ্য মনে করি এবং এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করা যেতে পারে ।'
এরপর এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন 'মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা' (পি.ই.-২৯৯ : পার্বত্য চট্টগ্রাম-১) : মাননীয় স্পিকার সাহেব, জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন যে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ 'বাঙালি' বলে পরিচিত হইবেন।
মাননীয় স্পিকার সাহেব, এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হল, সংবিধান বিলে আছে, "বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।" এর সঙ্গে সুস্পষ্ট করে বাংলাদেশের নাগরিকগণকে 'বাঙালি'বলে পরিচিত করবার জন্য জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে যে, বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যে সংজ্ঞা, তাতে করে ভালভাবে বিবেচনা করে তা যথোপযুক্তভাবে গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।
আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে আমরা লেখাপড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবদিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ---- কেউ বলেন নাই, আমি বাঙালি।
আমার সদস্য-সদস্যা ভাই-বোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না, আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায়...
স্পিকার : আপনি কি বাঙালি হতে চান না?
এমএন লারমা: মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয় নাই। আমরা কোনো দিনই নিজেদেরকে বাঙালি বলে মনে করি নাই। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাস হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক । আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।
.......(সংশোধনী পাশ হয়ে যায়).......
স্পিকার : আপনি বসুন। Please resume your seat.
(গণপরিষদ বিতর্ক : ১৯৭২)
স্পিকার মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বসিয়ে দিলেন। বক্তব্য শেষ করতে দিলেন না। এরপর এই বিতর্কে অংশ নিলেন সিলেট-২ আসনের গণপরিষদ সদস্য সেই সময়ের ন্যাপ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : মাননীয় স্পিকার সাহেব, এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হল, জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সাহেব যে সংশোধনী এনেছেন, তাতে মনে এ প্রশ্ন জাগে যে, বাংলাদেশের বাঙালি ছাড়া ভারতের কেউ বাস করছে। আমি শুধু বলতে চাই যে, বাঙালি বলতে এইটুকু বোঝায় যে, যারা বাংলা ভাষা বলে তাদেরকে আমরা বাঙালি বলি।
স্পিকার : Please resume your seat. আপনি বসুন, আপনি বসুন।
স্পিকার সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে একইভাবে বসিয়ে দিয়ে'হ্যাঁ' 'না' ভোটে পাস করিয়ে নিলেন প্রস্তাবটি। এই গণপরিষদে তিন জন ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্য। ফলে খুব সহজে পাস হয়ে যায় আইনটি। মর্মাহত হন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। তিনি তার মনের ক্ষোভ গোপন রাখলেন না। প্রকাশ করেন সেই বৈঠকেই।
শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা : মাননীয় স্পিকার, আমাদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে খর্ব করে এই ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধিত আকারে গৃহীত হইল। আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং প্রতিবাদস্বরূপ আমি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য গণপরিষদের বৈঠক বর্জন করছি।
[অতঃপর মাননীয় সদস্য পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান]
(গণপরিষদ বিতর্ক : ১৯৭২)
(এ বিতর্কটি 'মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জীবন ও সংগ্রাম' স্মারক গ্রন্থে সন্নিবেশ করা আছে|)

অনেক কিছু জানা গেল। ধন্যবাদ
ReplyDeleteঅনেক কিছু জানা গেল। ধন্যবাদ
ReplyDeleteজানা হলো
ReplyDeleteWe'llrememberforever & salute@ M.N Larma.
ReplyDelete