![]() |
| ছবি : ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরিয়া নৃত্য |
বন্ধুগণ, লেখাটি শুরু করেছিলাম গত ১৯ মে ২০২০ তারিখে। মাঝে আলসেমিবশত লেখার কাজটি আর এগোয় নি। আজ ব্যক্তিগত নানান কাহিনীর মিশেলে লেখাটি শেষ করলাম। বেশ বড়োসড়ো হয়ে গেলো লেখাটি। অনাগ্রহী/অনভ্যস্ত বন্ধুগণ প্লিজ এই দীর্ঘ লেখাটি এড়িয়ে চলুন। আর আগ্রহী হাতেগোনা কতিপয় পাঠক বন্ধুজন তো অবশ্যই পড়বেন, সেই ভরসা আমার বিলকুল রয়েছে। 🙏🙏🙏
ত্রিপুরা-চাকমা বন্ধুত্ববিহীন পাহাড়ি জীবন প্রকৃতি-বিরুদ্ধ, অকল্পনীয়, অমার্জনীয়
🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁
# সুপ্রিয় বন্ধুগণ, কীভাবে যে শুরু করবো, বুঝতে পারছি না। কারণ, যা লিখতে চাইছি তা আমার অন্তরের অকৃত্রিম অনুভবের কথা, অভিজ্ঞতার কথা। এখানে কোনোরূপ রাজনীতি নেই, কারো প্রতি ব্যক্তিগত কোনো হিংসা বা প্রতিহিংসা নেই। আমার এই স্বল্প-দীর্ঘ জীবনে ত্রিপুরা-চাকমাদের সম্পর্ক বিষয়ে নিজে ব্যক্তিগতভাবে যা দেখেছি, জেনেছি, অনুভব করেছি সেই অভিজ্ঞতার কথাই আজ এখানে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করছি।
# মাঝে মাঝে আন্তর্জালে এই ত্রিপুরা-চাকমা সম্পর্ক, বিসম্পর্ক নিয়ে নেটিজেন বন্ধুদেরকে হঠাৎ সক্রিয় হতে দেখি। স্বভাবজাত আলসেমিবশত এবং সেসব কথকতা সময়ের অপচয় ভেবে এড়িয়ে যাই। কিন্তু এখন দেখছি উক্ত সম্পর্ক-বিসম্পর্ক বিষয়ক বিতর্ক সাম্প্রতিককালের করোনা ভাইরাসের মতো কী এক অদৃশ্য কারণে যেনো দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই ভাবলাম, নিজের মতামতটি জানিয়ে রাখি। যাতে পরিস্থিতির গুরুতর রূপধারণে সহায়তা কিংবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে এই অধমকে ভবিষ্যতে কেউ অভিযুক্ত করতে না পারেন। পাহাড় নিয়ে কিছু লেখালেখি যেহেতু করি, তাই এইবিধ ইস্যুতে দায় এড়ানোর সুযোগও খুব বেশি নেই। তবে আমার মতামতের সাথে হয়তো অনেক অনলাইন, অফলাইন বন্ধুর মতামত মিলবে না। গণতন্ত্রের জয়যাত্রার এই যুগে সেটিই স্বাভাবিক। তাই মতের অমিলগুলোকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য বন্ধুদের কাছে অনুরোধ রাখছি। মতের এই অমিলও তো আসলে গণতন্ত্রেরই সৌন্দর্য। আর এই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যের আবশ্যকীয় শর্ত হলো, দ্বিমত/ভিন্নমত বা সমালোচনাকে অবশ্যই গঠনমূলক, ব্যক্তিগত আক্রমণ-রহিত, চরিত্রহনন-রহিত, মার্জিত, মানবাধিকারের মূল্যবোধসম্মত, ভদ্রস্থ এবং মানবিক মর্যাদাব্যঞ্জক হতে হবে। এর বিপরীতটি ঘটলে সেটি হয়তোবা হবে নিরেট মস্তানি, বখাটেপনা, একগুয়েমি; নয়তো মানুষের প্রতি, মানবাধিকারের প্রতি নিজের পারিবারিক শিক্ষা ও জন্ম-পরিবেশলব্ধ অশ্রদ্ধা।
# বন্ধুগণ, আমরা সবাই মার্কিন পুঁজিবাদী বিশ্বের বিশুদ্ধ সমাজতন্ত্রী, গণমানুষের বিবেকী কণ্ঠস্বর প্রফেসর নোয়াম চমস্কির একটি হুঁশিয়ারির কথা নিশ্চয়ই জানি। তিনি বলেছেন - মানুষকে শাসকগোষ্ঠীর অনুগত রাখার অন্যতম একটি কূটকৌশল হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমায়িত করে দিয়ে তার অভ্যন্তরে প্রবল, উত্তুঙ্গ বিতর্ক চালিয়ে যেতে পক্ষ ও প্রতিপক্ষকে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করা। এর ফলে লক্ষিত জনগোষ্ঠী সেই বিতর্ক-খুপরির মধ্যে পারস্পরিক বিতর্ক, হানাহানি, আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের আবর্তেই শুধু ঘুরপাক খেতে থাকবে। সেই সুযোগে শাসকগোষ্ঠী তার নিজের কাজ ও লক্ষ্য ইচ্ছেমতো হাসিল করে নেবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের প্রাণপ্রিয় জুম পাহাড়েও বুঝি এখন চমস্কি কথিত সেই বিশেষ দুরভিসন্ধিমূলক রাজনৈতিক থিয়োরিটিরই সফল প্রয়োগ ঘটছে। অথচ দেখছি, এ ব্যাপারে আমাদের কোনোরূপ চৈতন্যোদয়, অন্তর্দর্শন তথা হুঁশজ্ঞানই নেই!
# অপ্রিয় সত্য হলো, সম্ভাব্য একটি বিশেষ মহলের উপরোক্ত সংঘাতকামী ফাঁদ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হলে অন্তরের অন্তস্থলে মৈত্রী, করুণা, ক্ষমা, উদারতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। তথাগত বুদ্ধ বলেছেন, “শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয় না, মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার উপশম হয়। এটিই চিরকালীন ধর্ম।” এই মিত্রতা, উদারতা প্রদর্শনের চর্চাটা জুম পাহাড়ের সব জাতিকেই একসাথে অব্যাহত রাখতে হবে। তবে এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় তথা জাতি হিসেবে চাকমাদের ওপরই এর দায়ভার বেশি বর্তায় বলে অন্য অনেক বন্ধুর মতো আমিও মনে করি। বঙ্গবন্ধুর জমানায় তিনি এবং তাঁর সমসাময়িক অনেক বাঙালি নেতা পাহাড়ি মানুষকে/জুম্মদেরকে ‘উপজাতি’-অতিরিক্ত কোনো মর্যাদা বা সমানাধিকার না দিয়ে নিজেদের বাঙালি জাতিতে আত্মীকৃত করতে চেয়েছিলেন বলেই ‘শান্তিবাহিনী’ এবং দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা ঘটেছে - সেই বাস্তবতা ও প্রেক্ষিতটি আমরা নিশ্চয় এখনো ভুলে যাই নি। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানুষের জাতি হিসেবে চাকমাদেরকেই যে সর্বাগ্রে প্রশান্ত চিত্তে, ঐকান্তিক ধৈর্য ও একাগ্রতার সাথে পাহাড়ের বিভিন্ন জাতি/সম্প্রদায়ের মাঝে বাস্তবিক ও কৃত্রিমভাবে বিরাজিত ভেদবুদ্ধিসমূহ নিরসনে এগিয়ে আসতে হবে, তা অস্বীকার করার জো নেই।
# এখন প্রশ্ন হলো, পার্বত্য জাতিসমূহের নানামাত্রিক এই ভেদবুদ্ধির নিরসন কীভাবে ঘটবে? তার উত্তরও সেই একই। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং উদারতার চর্চা। এই প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় চাকমা রাজাবাবুর একটি আক্ষেপের কথা মনে পড়ছে। তাঁর সাথে যদিও আমার নৈমিত্তিক যোগাযোগ খুব বেশি নেই [মাঝে মাঝে আকস্মিকভাবে ফোনে বিরক্ত করা ছাড়া], তবুও নানা সময়ে/উপলক্ষে রাজাবাবুর সাথে আলোচনার যতোটুকু সুযোগ ও সৌভাগ্য ঘটেছে, সেসবের মুলুক-মুলুক, গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও পরামর্শগুলো যথাসাধ্য মনে রাখার চেষ্টা করেছি। অসাধারণ গুণীজন ও মানবতাবাদী এই মানুষটি একবার কথাপ্রসঙ্গে রাঙ্গামাটির এক স্বনামধন্য চাকমা মুরুব্বির অন্য একটি পাহাড়ি জাতি সম্পর্কে করা বর্ণবাদী, বিরূপ মন্তব্যের ব্যাপারে অধমের সামনে অস্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন। উক্ত স্বনামধন্য ব্যক্তি নাকি অন্য একটি পাহাড়ি জাতি সম্পর্কে ‘চিগোন জাদর চিগোন মন হিনেত্তেই এচ্যা আমার এধক সমস্যা অত্তে’ জাতীয় মন্তব্য করেছিলেন। শ্রদ্ধেয় রাজাবাবু আমাকে বললেন [যতদূর মনে পড়ে], “আমা জাদর মুরুব্বিউনে যুনি এসান্যা বর্ণবাদী হদা হন, সালেন আমা জুম্ম জাত্তুন হেনে এগত্তর অবাক, হেনে একলগে চিদা গুরিবাক।” বন্ধুগণ, আমারও মনে হয়, রাজাবাবুর এই আন্তরিক উপলদ্ধি বা প্রশ্নটির সমাধানের মধ্যেই জুম পাহাড়ের সবাই মিলে বৃহত্তর জুম্ম জাতীয় সংহতি বা বিসংহতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাটিও অনেকটা লুকিয়ে আছে। আশা করি আমরা সবাই ব্যক্তিগত আচরণ, আলাপন এবং লেখনি/সাহিত্য চর্চার সময় এই বিষয়টির ওপর যথাযথ মনোযোগ দেবো, গভীরভাবে ভাববো। ঠাট্টাচ্ছলে হলেও কারো চেহারা বা আচরণ অসুন্দর ঠেকলে ‘টিবিরা ধক্যা’, জটিল মানসিকতাসম্পন্ন কাউকে বোঝাতে ‘টিবিরার সাত্তান চারি’, মার্মাদের কারো একগুঁয়েমি বোঝাতে ‘আকার-ইকার নেয়্যা মগ’ - এই জাতীয় মন্তব্যগুলো চাকমাদের অবশ্যই চিরতরে পরিহার করা উচিৎ বলে আমিও মনে করি।
# এবার আমার স্কুল-জীবনের কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি, যেগুলো ত্রিপুরা-চাকমার সম্প্রীতি তথা সদর্থ-সম্পর্কবাচক। আমরা তখন দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালীস্থ পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথাশ্রম উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের [নামটির যাথার্থ্য/বানান বিষয়ে কিছুটা সন্দিহান] ক্লাশ সিক্স বা সেভেনের স্টুডেন্ট। ওই স্কুলেই আমি জীবনে প্রথমবার সহপাঠী হিসেবে কিছু ত্রিপুরা ছাত্র-ছাত্রীর ঐকান্তিক বন্ধুত্ব ও সাহচর্য লাভ করি। আমার সেই বন্ধুদের মধ্যে একজনের নাম ছিলো মনোজ নারায়ণ ত্রিপুরা। বাকি নামগুলো এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না বলে সত্যিই দুঃখিত এবং লজ্জ্বিত। হতে পারে আমার এই অক্ষমতাও হয়তোবা চাকমাদের অবচেতন মনে ত্রিপুরাদের প্রতি সম্ভাব্য-লালিত কিছু অবজ্ঞাপূর্ণ ধারণার ফলশ্রুতি, যা নিন্দনীয় এবং অবশ্যই সংশোধনীয়। সহপাঠী বন্ধু ননী, নিরঞ্জন, অরূপণের নিশ্চয়ই আমাদের সেই বন্ধুদের কথা মনে আছে। ত্রিপুরা বন্ধুরা মূলত ভৈরফা গ্রাম/অঞ্চল থেকে আসতেন। তবে একই গ্রাম থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতে আসা ‘ত্রিপুরা স্যারের’ কথা সুস্পষ্টভাবে মনে আছে। রাশভারী ব্যক্তিত্বের, গুরুগম্ভীর কণ্ঠের, সর্বদা ধবধবে সাদা ধূতি-পাঞ্জাবিতে পরিপাটি, সৌম্যকান্তি আমাদের রণজিৎ স্যার [পুরো নাম শ্রী রণজিৎ নারায়ণ ত্রিপুরা]। তাঁকে আমরা হেডস্যারের চেয়েও বেশি ভয় ও সমীহ করতাম। একবার পড়াশোনা সম্পর্কিত কী এক কারণে আমরা ছাত্ররা সবাই মিলে হেডস্যারের বিরুদ্ধে তুমুল বিদ্রোহ শুরু করলাম। অবশ্য এই হেডস্যার ছিলেন একজন চাকমা [বন্ধু রনেল যাঁর নাম দিয়েছিলো চে-কে-খু]। ছাত্রদের রণমূর্তি দেখে স্যারদের/ম্যাডামদের কেউই সামনে আসার সাহস পাচ্ছিলেন না। এ সময় ধূতি-পাঞ্জাবি পড়া সুঠামদেহী রণজিৎ স্যারকে ধীর পায়ে সামনে এগোতে দেখে আমাদের সবার প্রায় ত্রাহি মধুসুধন অবস্থা। বিদ্রোহী ছাত্রদের মধ্যে তখন আমাদের সহপাঠী তাঁর নিজের ছেলেও ছিলেন। স্যার সেদিন আমাদের সব কথা মনোযোগ সহকারে শুনে, কখনোবা ধমকের সুরে শাসিয়ে ছাত্রদেরকে নিবৃত্ত করে সমস্যার সমাধান হাসিল করলেন। আমরাও স্যারের কথা মেনে নিলাম, কারণ না মেনে উপায় ছিলো না। এর বহু বছর পর কোলকাতায় শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তের আশ্রমে স্যারের সাথে আবারো দেখা। তাঁরা তখন সম্ভবত জুম পাহাড়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সপরিবারে ভারতের ত্রিপুরায় আশ্রিত শরণার্থী। খুব সম্ভবত স্যারের কোনো এক সন্তান শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তের সহায়তায় ফ্রান্সে প্রেরিত ৭২ জন শিশুর একজন। তাই ভান্তের কাছে ছেলের খোঁজ নিতে এসেছিলেন। সামনে পেয়ে স্যারকে প্রণাম করলাম। প্রথমে চিনতে পারেন নি। বহুদিনের বিচ্ছেদ, তাই না চেনারই কথা। পরিচয় পেয়ে সেই আগের মতোই সস্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে আন্তরিক আশীর্বাদ করলেন। আমিও আমাদের সেই পুরনো দিনের শ্রদ্ধেয় ‘ত্রিপুরা স্যারের’ আশীর্বাদ অন্তর থেকে শিরোধার্য করে ধন্য হলাম। আমার কখনই মনে হয়নি স্যার এবং তাঁর ছেলেরা (আমাদের সহপাঠী) আমার অনাত্মীয়, অনাপন বা দূরের কেউ। স্যারও আমাদেরকে তাঁর নিজের ছেলের মতোই ভাবতেন বলে অনুভব করতাম। অবশ্য বাঁদরামি বিদ্যায় ধরা পড়লে বেত্রাঘাতসহ ব্যাপক শাস্তির ব্যবস্থাও করতেন।
# সেই একই ভৈরফা গ্রাম থেকে দেবেন্দ্র নামে আমাদের আরেকজন চাকমা বন্ধু ছিলো [বর্তমানে ফ্রান্সের অধিবাসী]। ক্লাশের/স্কুলের অধিকাংশ সময় সে ত্রিপুরা বন্ধুদের সাথেই মিশতো এবং ককবরক ভাষায় অনর্গল তাঁদের সাথে কথা বলতো। আমরা মাঝে মাঝে দেবেন্দ্রের উদ্দেশ্যে ত্রিপুরা ভাষাটি আমাদেরকেও শিখিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য টিপ্পনী কাটতাম। কিন্তু দেখতাম, বন্ধু দেবেন্দ্রের তাতে কোনো হেলদোলই নেই। আমাদের চাইতে স্বগ্রামের ত্রিপুরা বন্ধুরাই ছিলেন তার কাছে প্রাণাধিক প্রিয়জন। কিন্তু বন্ধু দেবেন্দ্র সবসময় ত্রিপুরা বন্ধুদের সাথে মিশছে বলে এবং আমি নিজে তাদের ভাষা বুঝতে পারছি না বলে তাদেরকে কখনোই আমার কাছে ‘অপর’, ‘অনাপন’ মনে হয় নি। এর কারণও সম্ভবত যুগ যুগ ধরে ত্রিপুরাদের এবং পাহাড়ের অপরাপর জাতিসমূহের সাথে চাকমাদের স্বাভাবিক, ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক। যেমন আমরা ছোটবেলায় বিঝু-বৈসুক-সাংগ্রাই এর সময় নিজেদের বাড়ির আঙ্গিনায় ঢাকঢোল-বাজনা সহকারে ত্রিপুরাদের ‘গোরেয়া’ নৃত্যদলের আগমন ঘটলে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠতাম। শ্রদ্ধার সাথে তাঁদেরকে চালডাল-মুড়ি-ফলমূল ইত্যাদি দিয়ে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করতাম। এছাড়া আরেকটি ঘটনাও আমার এই ত্রিপুরা-প্রীতি বা জাতিবর্ণ-নিঃস্পৃহতায় বেশ প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করি। এক সময় পাহাড়ের সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত শতকের সেই ৮০-৯০ এর দশকে আমাদের পরিবারকে নিজেদের পুরনো মহাজনী ব্যবস্থা, বাগানবাড়ি, সুন্দর একটি বাংলো [কোনো এক ফিরিঙ্গি সাহেবের নকশাকৃত], পরিপার্শ্ব মোহন প্রকৃতি-রাজ্যপাট, আঞ্চলিক সুস্থিতি এবং দুইশত বছরের পুরনো স্বগ্রামের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তিন/চারবার বহু বছরের জন্য অনিশ্চিত, দুঃসহ উদ্বাস্তু জীবন বরণ করে নিতে হয়েছিলো। তবে বংশানুক্রমে প্রাপ্ত শিকারের নেশা বাবারও ছিলো বিধায় উদ্বাস্তু জীবনেও তিনি তা ছাড়তে পারেন নি [উল্লেখ্য যে, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আমাদের পরিবারে দুইটি লাইসেন্সকৃত বন্দুক ছিলো, যেগুলো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পরে সরকার বাহাদুর কেড়ে নেয়]। বাবার সেই শিকার খেলা বা নেশার সুবাদে নতুন সব অঞ্চলে, গহীন বন-প্রকৃতির প্রায় অচেনা-অজানা সব আরণ্যক পরিবেশে সে সময় যাঁরা তাঁর শিকারসঙ্গী হয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন জাতিগত পরিচয়ে ত্রিপুরা জনমানুষ। পিতার সেই সহকারীদের সাথে, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সাথে আমরা সবাই একাত্ম হয়ে মিশতাম। কে ত্রিপুরা, কে চাকমা সেই ভেদাভেদ বা মনোভঙ্গি কখনোই আমাদের মাঝে ছিলো না। এর বহু বছর পরে নিজেদের গ্রামে ফেরার পরও দেখেছি, বাবা এক অনাথ ত্রিপুরা ছেলেকে নিজের সন্তানজ্ঞানে প্রতিপালন করছেন, স্কুলে পড়াশোনার খরচ যোগাচ্ছেন। বড়দিদির পরিবারেও দেখেছি নুনেল নামের এক ত্রিপুরা ছেলে পরিবারেরই একজন অবিচ্ছিন্ন সদস্য হিসেবে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে উঠছে। মাঝে মাঝে বড়সড় কিছু এডভেঞ্চার পরিচালনা করেও ক্ষমা পেয়ে যাচ্ছে। কারণ বড়দিদি এবং জামাইবাবুকে সে ‘মা’ এবং ‘বা’ বলে ডাকে। এছাড়া মনে পড়ে, মারিশ্যা বাজারে আমার নানাবাড়ির সন্নিকটে একদা সাজেকের মিজো চেয়ারম্যানের একটি বাড়ি ছিলো। সেই বাড়িতে মিজো চেয়ারম্যানের ছোট্ট ছেলেটি ছিলো আমার বাল্যবেলার কেরম খেলার সাথী। কখনোই মনে হয়নি সে মিজো আর আমি চাকমা এবং আমরা দু’জন আলাদা প্রজাতির কেউ [এখন যেমনটি মিজোরামে ঘটছে]। ক্ষিধে পেলে আমরা খেলা ছেড়ে উঠে গিয়ে সেই পিচ্চি বয়েসেই দু’জনে মিলে শুকরের মাংস ফালি ফালি করে কেটে তার ওপর শুধুমাত্র সামান্য কিছু লবণ ছিটিয়ে অল্প তেলে ভাজা করে খেতাম। মিজো চেয়ারম্যানের বাড়ির দেওয়ালে ঝোলানো সুন্দর বন্দুকটির ছবি এখনো আমার মানসপটে অম্লান হয়ে আছে। আমাদের বাড়িতে বাবার বন্দুকটি কখনো সেভাবে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখতে দেখিনি। একবার আমার মিজো বন্ধুটি যখন সাজেকে ফিরে যাচ্ছিলো, তখন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছিলাম। সেই স্মৃতি কখনো ভুলবার নয়। আসলে নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব কিংবা মানবিক উচ্ছ্বাস জাতীয়তার কোনো ভেদরেখা মানে না। বিশেষ করে সেটি যদি একই অঞ্চলের, সমরূপ সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে ঘটে থাকে। অনুমান করি, বন্ধু দেবেন্দ্রেরও তার ত্রিপুরা বন্ধুদের নিয়ে আমার অনুরূপ স্মৃতি রয়েছে। আরেকটা কথা, যখন রাষ্ট্রের খবরদারি ছিলো না, তখন পাহাড়ি জাতিসমূহের পারস্পরিক মানবিক সম্পর্ক স্থাপন খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার ছিলো। রাষ্ট্রের বিশেষ পলিসি যখন আদিবাসীদের সব বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করেছে, তখনই এইসব জাতিগত বিভেদ তথা পারস্পরিক দূরত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বিষয়গুলো কে কাকে কীভাবে বোঝাবে?
# চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি জাতির মধ্যে বিরাজিত সুসম্পর্ক বিষয়ে এতদঞ্চল নিয়ে লিখিত প্রাচীন গ্রন্থসমূহে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ‘চাকমা জাতি’ গ্রন্থের প্রণেতা শ্রী সতীশচন্দ্র ঘোষ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে [এই মুহূর্তে তথ্যটির নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাসংখ্যা উল্লেখ করতে পারছি না বলে দুঃখিত], ত্রিপুরা রাজ পরিবারের একজন সদস্য এক সময় চাকমা রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করলে চাকমা রাজা তাঁকে যথাযথ সম্মানের সাথে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদানসহ তাঁর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূমি এবং অন্যান্য সুবিধাদি সহযুক্ত একটি রাজকীয় জীবন যাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিলেন। এছাড়া আমাদের শ্রদ্ধেয় গুণীজন, বর্ষীয়ান লেখক, সাবেক আমলা ও কূটনীতিক শ্রী এস এস চাকমা তাঁর একটি গ্রন্থে লিখেছেন যে, (খুব সম্ভবত) সাবেক স্বৈরশাসক জিয়া এবং এরশাদ সাহেবের আমলে [সঠিক সময়কালটি জানার জন্য তাঁর বইটি আরেকবার পড়তে হবে] চাকমাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হামলা পরিচালনার জন্য ত্রিপুরা, মার্মা এবং মুরংদেরকে পরপর কয়েকবার সরাসরি উস্কানি প্রদান করা হয়েছিলো। মুরংদের ক্ষেত্রে কিছুটা সফল হতে পারলেও রাঙ্গামাটি এবং খাগড়াছড়ি জেলায় কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর চাকমা-বিরোধী সেই পরিকল্পনা সর্বাংশে ভেস্তে যায়। কারণ সে সময় চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের পারস্পরিক ধর্মগত, সংস্কৃতিগত এবং জাতিগত আন্তঃসম্পর্ক এতোটাই সুদৃঢ় ছিলো যে, কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী অভিপ্সিত সেই হাঙ্গামা পরস্পরের বিরুদ্ধে পরিচালনা সত্যিই এক অকল্পনীয়, অসাধ্য ব্যাপার ছিলো। তখন ত্রিপুরা জাতিতে শ্রী সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা, জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি শ্রী...রোয়াজা, মানিকছড়ির শ্রদ্ধেয় মং রাজা শ্রী মং প্রু সাইন, তৎপরবর্তী রাজা শ্রী রাজীব রায়, খাগড়াছড়ির চাকমা এমপি শ্রী উপেন্দ্রলাল চাকমা প্রমুখ অসাম্প্রদায়িক নেতৃবৃন্দ জীবিত এবং পার্বত্য জাতিসমূহের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে সদা তৎপর ছিলেন। তাঁরা সব সময় রাঙ্গামাটির চাকমা এবং বান্দরবানের বোমাং রাজ পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও শলাপরামর্শের ভিত্তিতেই পাহাড়ের বৃহত্তর স্বার্থে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। ফলে কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর চাকমা বিরোধী হাঙ্গামার পরিকল্পনাটিও সেদিন ত্রিপুরা ও মারমা জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ সশরীরে ঢাকায় উপস্থিত হয়ে চাকমা নেতৃবৃন্দকে জানিয়ে দেন। ঢাকায় ব্যাপক-বিস্তারিত আলোচনার পর যে কোনো মূল্যেই পাহাড়ের জাতিসমূহের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার অঙ্গীকার নিয়ে তাঁরা আমাদের জুমপাহাড়ে ফিরে যান। বর্তমানে সেই শ্রদ্ধেয়, সুমহান নেতৃবৃন্দ আমাদের মাঝে আর বেঁচে নেই। কিন্তু কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর সেই তিন/চার দশক আগের ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতি তথা দুরভিসন্ধি এখনো পূর্ববৎ বহাল আছে। তাই আমাদের জুম্ম জাতির নানান সম্প্রদায়ের বর্তমান নেতৃবৃন্দ তাঁদের সেই অসাম্প্রদায়িক পূর্বপুরুষদের বিশেষ পাহাড়ি মূল্যবোধের অনন্য মানবিক মর্যাদা, স্বপ্ন ও সম্প্রীতি কীভাবে রক্ষা করবেন কিংবা আদৌ রক্ষা করতে পারবেন কিনা, সেটি এক মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসলে পাহাড়ের এসব জাতিকে এখন কে পরিচালনা করে বা আদৌ কেউ করে কিনা, তা নিয়ে মাঝে মাঝে সত্যিই ধন্ধে পড়ে যাই। তবুও যখন দেখি একজন ত্রিপুরার সাম্প্রদায়িক অবস্থানের বিরুদ্ধে ত্রিপুরা জাতিরই অনেক তরুণ-তরুণী সোচ্চার হচ্ছেন কিংবা একজন চাকমার সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে অন্য অনেক চাকমা তরুণ-তরুণী উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন, তখন সত্যিই আমাদের জুম্ম জাতির এবং সমগ্র মানব জাতির অগ্রযাত্রার ব্যাপারে আশাবাদী না হয়ে পারি না।
# আমার ঝুড়িতে ত্রিপুরা-চাকমা সদ্ভাব ও সম্প্রীতির আরও কিছু নমুনা ও সুফল মজুদ আছে। যেমন, এই অধমের পক্ষে একসময় ত্রিপুরার বর্তমান মহারাণী মাননীয়া এমপি রাজমাতা শ্রীমতী বিভু কুমারী দেবীর সান্নিধ্য অর্জন সম্ভব হয়েছিলো, আজ থেকে প্রায় আড়াই দশক আগে। তিনি তখন দিল্লীতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের একজন প্রভাবশালী পার্লামেন্টারিয়ান। আমি তখন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং একজন আনাড়ি একটিভিস্ট। অরুণাচলের চাকমা ও হাজংরা তখন নিজেদের জন্য ভারতের নাগরিকত্বের দাবিতে মরিয়া। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রিন সিগন্যাল থাকা সত্ত্বেও নাগরিকত্ব প্রদানে বাধ সাধছিলেন অরুণাচলের তৎকালীন কংগ্রেস দলেরই মুখ্যমন্ত্রী শ্রী গেগং আপাং। তবে ভারতের নর্থ-ইস্টের যাবতীয় কর্মকাণ্ড দেখভালের জন্য সে সময় কংগ্রেসের একটি বেশ শক্তিশালী কমিটি সক্রিয় ছিলো। ত্রিপুরার মাননীয়া মহারানী [মহীশুরের রাজ পরিবারের সদস্য, ভারতের স্বনামধন্য ক্রিকেটার অজয় জাদেজাদের নিকটাত্মীয়] ছিলেন সেই কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য। আর সেটি জেনেই এবং নাগরিকত্ব বিষয়ে আমাদের জেএনইউ-তে অনুষ্ঠিতব্য একটি সেমিনারে আমন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই একদিন আমি দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছোটভাই নিখিলকে নিয়ে ত্রিপুরা মহারানীর দিল্লীস্থ দরবারে হাজির হয়েছিলাম। অবশ্য আগেভাগে ফোনে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য তাঁকে জানিয়েছিলাম। তিনি আমাদের সাথে বেশ একটি ঘরোয়া পরিবেশে, অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে, নানান উপাদেয় খাদ্যসামগ্রী সহযোগে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ জুড়ে দিয়েছিলেন [ছোটভাই নিখিলের সবকিছু মনে আছে কিনা জানিনা]। একসময় নিজের ড্রয়ার খুলে একটি ফাইল এনে অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী গেগং আপাংকে চাকমাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব ইস্যুতে লেখা একটি চিঠি বেশ উচ্চস্বরে পড়ে শোনালেন। এরপর সেই চিঠির একটি কপি আমার হাতে দিয়ে বললেন [যা আমি পরে বয়সজনিত চপলতা/বাল-খিল্যপনাবশত হারিয়ে ফেলেছি], আমি চাকমাদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে সবসময় লড়েছি, ভবিষ্যতেও লড়বো এবং পাশে থাকবো। গেগং আপাংয়ের গোঁয়ার্তুমিকে সমালোচনা করে কিছু গালিসূচক মন্তব্যও করলেন। এরপর রাজপরিবারের ব্যক্তিগত কিছু বিষয়-আশয় প্রসঙ্গক্রমে আলোচনায় উঠে এলো। নিজের দুই মেয়ে তখন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধে অবতীর্ণ। বললেন, সুহাস চাকমা [আমাদের বন্ধু, আমার ইয়ারমেট] সাহায্যের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরপর কী একটা প্রসঙ্গে যেন বললেন, “চাকমা বয়েজ আর সো স্মার্ট!” কিছুক্ষণ পর আমাদের খাওয়া-দাওয়া, আলোচনার ফাঁকে রাজদপ্তরের একজন সহকর্মী এসে অস্ফুট স্বরে রানীমার কানে কী যেন বললেন। অতঃপর রানীমা আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে জানালেন, তাঁকে এখনই এই আলোচনা সমাপ্ত করতে হবে। কারণ, ত্রিপুরার মহারাজা এয়ারপোর্টে এসে নেমেছেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে এসে পৌঁছাবেন। বললেন, সেমিনারে উপস্থিত থাকতে না পারলেও চাকমা ইস্যুতে তাঁর আন্তরিক সমর্থন অব্যাহত থাকবে এবং আমরা যেন এই ইস্যুতে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেসবের ফিডব্যাক তাঁকে নিয়মিতভাবে সরবরাহ করি। রানীমাতার ব্যতিব্যস্ততা দেখে আমরাও সেদিন তাঁর মূল্যবান সময় প্রদানের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, তাঁকে প্রণাম করে [যদিও খুব অপ্রস্তুত ও বিব্রত বোধ করেছিলেন] বিদায় সম্ভাষণ জানাই। কিন্তু আমার মানসপটে এই মাতৃতুল্য ত্রিপুরা রাজমাতা মহারানীর সাথে কথোপকথনের সেই অমূল্য স্মৃতি আজীবন অম্লান থাকবে।
# ত্রিপুরার মহারানী যে চাকমাদের ন্যায্য অধিকারের ব্যাপারে সর্বদা তৎপর ছিলেন তার আরেকটি প্রমাণ উল্লেখ করছি। পরম শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তের আমন্ত্রণে ত্রিপুরা রানীমাতা ১৯৯৩ সালে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘বিশ্ব চাকমা সম্মেলনে’ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন। উক্ত সম্মেলনে তিনি চাকমাদের অধিকারের স্বপক্ষে ব্যাপক জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান শেষে অনেক ক’টি গঠনমূলক সুপারিশ প্রদান করেছিলেন, যেগুলোর অনুপুঙ্খ বাস্তবায়ন এখনো সম্ভবপর হয়ে ওঠে নি। এরপর দেখলাম, অতি সম্প্রতি তাঁরই সুযোগ্য পুত্র বুবাগ্রা শ্রী প্রদ্যোত কিশোর মানিক্য ত্রিপুরার জনগণের অধিকার কীভাবে সংরক্ষিত হবে তার বয়ান দিতে গিয়ে চাকমাদের অধিকার সংরক্ষণের কথাও বললেন। আর ত্রিপুরার বিভিন্ন চাকমা সংগঠনও [ছাত্র-যুব-নারী-সাধারণ-সর্বভারতীয়] সম্প্রতি ত্রিপুরা রাজ্যে ব্রু জাতিগোষ্ঠীর পুনর্বাসনকে সমর্থন এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বরাবর মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি এবং এক মিজো নেতা কর্তৃক ত্রিপুরার বর্তমান মহারাজাকে সাম্প্রদায়িক চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এসব দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে আমাদের ত্রিপুরা-চাকমা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামেরই প্রতিফলন। যারা এসবের আদ্যপান্ত না জেনে শুধুমাত্র কিছু কালা-চিদিরা ভূত-প্রেতের উস্কানিতে লাফালাফি করেন, তাঁদেরকে অবশ্যই জুমপাহাড়ের শান্তিপ্রিয় জনগণের সবার [জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে] কঠোর নজরদারিতে রাখা উচিত।
# প্রাচীন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে বর্তমানকালের চাকমা রাজা ও ত্রিপুরা মহারাজার মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিস্থাপন এবং সেই লক্ষ্যে আর্থ-সামাজিক নানা ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযগিতার/উদ্যোগের সম্প্রসারণসহ চিন্তার-ভাবের-পরিকল্পনার প্রাত্যাহিক আদান-প্রদান সন্নিহিত পার্বত্য অঞ্চলে শান্তির এক বাতাবরণ তৈরি করবে বলে মনে করি। এপার-ওপার দুই পাড়ের ত্রিপুরা বন্ধুগণও এই দুই রাজ পরিবারের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবেন, সেই প্রত্যাশা রাখি। একটি বাগানে হরেক রকমের, নানান বর্ণের ফুল থাকে। যেমন লাল, সাদা, বেগুনী, গোলাপি, আসমানি, হলুদ, কমলা, নীল, সবুজ, ম্যাজেন্টা প্রভৃতি নানান বর্ণের ফুলে সজ্জিত আমাদের বাগানগুলো। একইভাবে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, চাক, লুসাই, খিয়াং, বম, পাংখো প্রভৃতি বর্ণিল জাতির আত্মপরিচিতি ও ফুল-পল্লবে সুশোভিত আমাদের জুমপাহাড়। বৈচিত্র্যের এই সম্পদকে, আদিবাসীদের মূলানুগ এই অস্তিত্বকে আমাদের অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাই প্রয়োজন পাহাড়ের সকল জাতির/সকল শ্রেণির মধ্যে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, মৈত্রী-সংবেদন-ভালোবাসার অকৃত্রিম মেলবন্ধন এবং সুদৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। নিরন্তর চর্চার মাধ্যমে এই সংবেদনশীলতা অর্জন এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠা অবশ্যই সম্ভবপর। যেমন, জাতিগত পরিচয়ে আমি একজন চাকমা। কিন্তু তাই বলে আমার কখনো বিনোতাময় ধামাই, অভিলাষ ত্রিপুরা, হেমন্ত ত্রিপুরা, সন্তোষ ত্রিপুরা, চৈতালি ত্রিপুরা, চয়ন ত্রিপুরা কিংবা মান্যবর প্রশান্ত ত্রিপুরা বা শক্তিপদ ত্রিপুরাদাকে [যাঁদের সান্নিধ্য পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি] ‘অপর’, অনাত্মীয়, অপরিচিত বা দূরের কেউ মনে হয়নি। সন্তোষ ও চৈতালির সাথে অনেকবার পরিকল্পনা করেও একত্রে বসা হয়নি। এখন তাঁরা সুদূর অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা। কিন্তু অন্তরের টানটা তো ঠিকই রয়ে গেছে। সেদিন চৈতালির সাথে ফোনে অনেকক্ষণ কথা বললাম।
# বন্ধুগণ, লেখাটি অনেক দীর্ঘ হয়ে গেলো বলে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। আসলে আরও অনেক কিছুই লেখার বাকি ছিলো। কিন্তু পাঠকদের, বন্ধুদের ধৈর্যচ্যুতির কথা ভেবে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে লেখাটি শেষ করছি। সেটি হলো, একটি বিশেষ গোষ্ঠী যে আমাদের জুমপাহাড়ের হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত, সমাদৃত সবকিছুকে তাঁদের ভুঁইফোঁড় নানান গবেষণা ও তৎপরতার মাধ্যমে তছনছ করে দিতে চাইছে, তা আজ অনলাইনসহ নানাবিধ মাধ্যমে তাঁদের বহুমাত্রিক তৎপরতা থেকে সুস্পষ্ট। কারা, কোথা থেকে এটি করছে তার কিছুটা আভাস আমি এক রিপোর্টার বন্ধুর কাছ থেকে একদিন জেনেছিলাম বলে অনুমান করি। তিনি একদিন আমাকে এমন এক গবেষকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যিনি কথার ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই প্রসিতদা, রবিশঙ্করদের রেফারেন্স উত্থাপন করছিলেন। বললেন, তিনি তাঁর গবেষণাকাজে প্রসিতদাদের কাছ থেকে প্রচুর সহযোগিতা পেয়েছেন। জানতে চাইলাম, তাঁর গবেষণার বিষয়টি আসলে কী! রোগা-পাতলা সেই গবেষক ভদ্রলোকটি জানালেন যে, আমাদের জুম পাহাড়ের সবকিছুই নাকি তাঁর গবেষণার অন্তর্ভুক্ত। বললেন, এই যে আপনারা সিমেই আলু, কচু, বেগোলবিজি, আমিল্যা, পুঝোক, বাতবাত্যা শাক ইত্যাদি আদিবাসীদের নিজস্ব প্রোডাক্ট হিসেবে গণ্য করেন এবং খেয়ে থাকেন, সেসবের কোনোটিই আসলে আপনাদের পাহাড়ের স্বভূমিজাত নয়। সবই এসেছে বাংলাদেশের অন্যান্য সমতল জেলাগুলো থেকে। সুতরাং পাহাড়ের কোনোকিছুই আসলে পাহাড়ি/স্থানীয়দের নিজস্ব সম্পদ নয়। সবই সমতল থেকে আমদানিকৃত। তাই পার্বত্য তিন জেলার মানুষ-ভূসম্পদ-প্রকৃতি সবকিছুই বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলেরই বর্ধিত অংশ এবং সে কারণে এই তিন পার্বত্য জেলার ওপর এদেশের সব মানুষেরই ভোগদখলের সমানাধিকার রয়েছে।
আমি তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করে বললাম, এই যে বাংলাদেশে আপনি চা, কফি, কোক-পেপসি, এলাচ-গোলমরিচ-খেজুর-ভায়াগ্রা ইত্যাদি সেবন করেন এবং সাবান-শ্যাম্পু-আতর-সুগন্ধি প্রভৃতি গায়ে মাখেন, তার সবকিছুই কি আপনার স্বদেশজাত? যদি না হয়, তাহলে সেই একই যুক্তিতে উৎপাদক আরবীয় দেশসমূহ, চীন-জাপান-আমেরিকা-ব্রিটেন কি আপনার দেশটির ওপর মালিকানা ও ভোগদখল কায়েম করতে পারে? আর একটি কথা - আপনি কি পার্বত্য চট্টগ্রামের সব পাহাড়, নদী-ঝর্ণা, গাছপালা, বনাঞ্চল, পশুপক্ষী, খনিজ সম্পদ এবং তেরটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আপনার দিনমজুরের মাথার টুকরিতে করে সমতলের জেলাগুলো থেকে পাহাড়ে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন?
# সেদিন আমার সাথে সেই কথিত গবেষকের এইবিধ বিতণ্ডা শুনেই সম্ভবত রিপোর্টার বন্ধুটি আমাকে বেশ রাত্রিবেলা ফোন করে অনুরোধ করলেন, আমি যেন তাঁকে ভুল না বুঝি। জানালেন, উক্ত গবেষকের কাজই হলো বিশেষ একটি প্রকল্পে ইনপুট সরবরাহ করা। আর সেই প্রকল্পটি নাকি কুমিল্লা অঞ্চল থেকে পরিচালিত হয়। সম্ভবত কোটি-কোটি টাকার একটি প্রকল্পের তাঁরা মৌমাছি সৈনিক, যাদের কাজ রানী মৌমাছিকে পরিতৃপ্ত করা। তাঁদের সেই প্রকল্প থেকে ইতিমধ্যে অনেক অখাদ্য গবেষণা, বইপুস্তক বাজারে এসেছে। তারই কিছু নমুনা সম্প্রতি এক ত্রিপুরা ছেলের বয়ানে দেখলাম, যা নিয়ে কিছু চাকমা ছেলেপুলেও লম্ফঝম্ফ করছে মর্মে ঠাহর হলো। আসলে অখাদ্য সেই বইটির কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর আমি নিজেও আজ থেকে প্রায় চার/পাঁচ বছর আগে উক্ত লেখককে সরাসরি ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি এইসব আজগুবি তথ্য কোথা থেকে পেলেন? ভদ্রলোক আমাকে জানিয়েছিলেন, বার্মাসহ অনেক জায়গা ঘুরে, কঠোর পরিশ্রম ও গবেষণা শেষে তিনি তাঁর বইটি পাঠকের দরবারে হাজির করেছেন। পরে আমার বারম্বার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে দেখলাম ফোনটি বারবার কেটে যাচ্ছে, তিনি উত্তর দিচ্ছেন না, ফোনও ধরছেন না। অথচ তাঁর পুস্তকে তিনি চাকমাদের মহিয়সী রানী কালিন্দীকে পর্দানশীন মুসলমান রমণী হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। আরে ব্যাটা, সেই যুগে তো হিন্দু এবং বৌদ্ধ নারীরাও একইভাবে পর্দাপ্রথা মেনে চলতেন! তাহলে রানী কালিন্দী কি একইসাথে বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিষ্টান এবং মুসলমান ছিলেন?
# আসলে বন্ধুগণ, এইসব তৎপরতা সেই একটি জায়গা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে মর্মে প্রতীয়মান হয়, যা আমার রিপোর্টার বন্ধুর ইঙ্গিত থেকেও সুস্পষ্ট। সেখানে কোটি কোটি টাকার গবেষণাকাজ চলছে এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে, হাহুতাশ করে এই রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি মিলবে না। আমাদের এখন প্রয়োজন স্থিতধী প্রজ্ঞা, দলসমূহের ঐক্য, নিবিড় গবেষণা এবং নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। যেমন ধরুন, নিজেদের সম্পাদনায় একটি দৈনিক পত্রিকা আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন। এছাড়া প্রয়োজন ব্রিটিশ লেখকগনসহ ঔপনিবেশিক শাসকদের যাবতীয় বইপুস্তক, দলিল দস্তাবেজ বাংলায় অনুবাদ এবং ব্যাপকতর প্রচারণা [আমাদের অতীত ইতিহাস সঠিকভাবে জানার জন্য এবং ভবিষ্যতের করণীয় স্বচ্ছভাবে নির্ধারণের জন্য]। সেই মহতি কাজে আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই। আমার সাথে চাই একাডেমিক্যালি সাউন্ড এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আরও ৪-৫ জন চৌকস তরুণ-তরুণী। তাঁরাও অবশ্য আমার বিগত ৫-৬ বছরের অনলাইন লেখালেখির অভিজ্ঞতার সুবাদে একপ্রকার চিহ্নিত হয়েই আছেন। এখন বড়ো সমস্যা ফান্ডিংয়ের। একাজে অবশ্যই ১৫-২০ লক্ষ টাকার প্রয়োজন। আমি এই পরিমাণ অর্থ নিজের পারিবারিক বাগানের সেগুনকাঠ বিক্রি করে জোগাড় করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের চদানির পুতেরা চাঁদা হিসেবে প্রায় ১৫-১৬ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমাদের পুরো পরিবারকে এখন পথে বসিয়েছে। আমার ছোট ভাই ১৫-২০ লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে এখন পাগলপ্রায়। অথচ আমাদের কুত্তার চদানির পুতেরা কাঁধে একটি থুম্বুক ঝুলিয়ে এখনো দেশ-জাত উদ্ধারের মঙ্গলসুত্র শুনিয়েই যাচ্ছে। তবুও আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন হয়তো সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। তাই স্বজাতির কল্যাণে নিজে কিছু করার অভিপ্রায় এখনো লালন করি। আমার সেই অভিপ্রায়ে, সদিচ্ছা পূরণে কেউ কি সাড়া দেবেন? জুম্ম জাতির ভাগ্যে, অগ্রগতিতে স্থায়ী অভিঘাত রাখার এই উদ্যোগে কেউ কি এগিয়ে আসবেন? সিদ্ধান্ত আপনাদের। নাহলে এভাবেই এলেলে-বিলেলে স্টাইলে আমাদের সবার জীবনতরী প্রাকৃতিক নিয়মে একদিন শুন্য দিগন্তরেখায় মিলিয়ে যাবে! আমাদের প্রাণপ্রিয় জুম পাহাড়ের জন্য নিজের তরফে কোনোরূপ লাভ বা ক্ষতির চিহ্ন রেখে যাওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।
সবাই সুখী হোন। সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু! 🙏🙏🙏
ছবিঃ অনলাইন নেটওয়ার্ক থেকে সংগৃহীত।

No comments:
Post a Comment