![]() |
| ছবি : কাপ্তাই বাঁধে জলমগ্ন চাকমা রাজবাড়ী |
লিখেছেন : ধীমান ওয়াংঝা
🍁🍁 বন্ধুগণ, আজ আমার একটি পুরনো লেখা আপনাদের সকাশে নিবেদন করছি। এটি ‘ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর আগ্রাসন’ শিরোনামের দীর্ঘ লেখার উপ-শিরোনামভুক্ত অংশবিশেষ। ইতিপূর্বে সমগ্র নিবন্ধটি ‘সিএইচবিডি-ডট-ওআরজি’ পোর্টালে ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো। এরপর উক্ত বছরেই কবি আলোড়ন খীসা সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘হুচ’ এর ৫ম বর্ষ ২য় সংখ্যায় লেখাটি পুনর্বার মুদ্রিত হয়। পরে আমি ২০১৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত আমার ‘আদিবাসী জুম্ম জাতির ভবিষ্যৎ’ পুস্তকে লেখাটিকে অন্তর্ভুক্ত করি [পৃষ্ঠা ১৫-৩৪]। ভাবলাম, অনলাইন দুনিয়ায় বর্তমানে চলমান ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’, ‘চাকমা জাতীয়তাবাদ’, ‘জাতিসত্তা-জাতি-রাষ্ট্র’ ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনায় হয়তোবা আমার এই খণ্ডিত লেখাটি কিছুটা হলেও সহায়ক হতে পারে। তবে লেখাটিকে আমার অর্ধযুগ আগের উপলব্ধি হিসেবে বিবেচনা করার এবং ক’দিন আগে ‘ত্রিপুরা-চাকমা বন্ধুত্ব’ বিষয়ক লেখাটির সাথে মিলিয়ে পড়ার জন্য বন্ধুদের প্রতি সবিশেষ অনুরোধ রাখছি।
🍁🍁 আরেকটি কথা। আমি লক্ষ করেছি যে, আমার লেখাগুলো অনেকে নিজেদের গ্রুপে/ওয়ালে শেয়ার করেন। কিন্তু সেসব গ্রুপে/ব্যক্তিগত ওয়ালে শেয়ারকৃত আমারই পোস্টে অধমের কোনো প্রবেশাধিকার থাকে না। প্লিজ আমাকে অন্তত সেই প্রবাশাধিকারটি দিন। আর আমার পোস্টে যাঁরা মন্তব্য/মতামত প্রদান করেন তাঁদের অনেককে যথাসময়ে প্রত্যুত্তর দিতেও আমি অপারগ হই। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমার অমার্জনীয় আলসেমি এবং টাইপিংয়ের শ্লথগতি এই বিপর্যয়ের কারণ। তাই বন্ধুগণ, যথাসময়ে উত্তর না পেলে প্লিজ আমাকে শত্রু ভাববেন না। অনুগ্রহপূর্বক মার্জনা করবেন। বন্ধুত্বের অনুরোধ একসেপ্ট করার ক্ষেত্রেও আমার সেই একই সমস্যা, অনিয়মিত চেকিং, আলসেমি, খামখেয়ালিপনা, নানারূপ আন্তর্জালিক বিড়ম্বনা। তবে আপনাদের মন্তব্য/মতামতগুলো যে আমার পরবর্তী লেখার অনুপ্রেরণা তথা জ্বালানি হিসেবে কাজ করে, তা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। সেজন্য বন্ধুদের সবার প্রতি আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
🍁🍁 এবার অনলাইনের আলোচ্য সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে মোটাদাগে কিছু আলোচনা সেরে নিই। আমার মতে, জুম্ম জাতীয়তাবাদের সাথে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ইত্যাদি জাতীয়তাবাদের কোনো আপাত-বিরোধ নেই বা থাকার কথা নয়। বরং এইসব জাতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি আমরা সবাই সবার জাতিভিত্তিক অধিকারগুলোকে সেভাবে মেনে নিই। তবে সেটি বৃহত্তর স্বার্থে জুম্ম জাতীয়তাবাদকে সবার আশ্রয় বা আরাধ্য হিসেবে মেনে নিয়েই। ভারতে যেমন বহুজাতি এবং তাদের নিজস্ব জাতিভিত্তিক সংসদ বা সংগঠন রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়/জাতীয় ঐক্যবোধের বেলায় তারা আবার সবাই মিলে তখন এক ভারতীয় মহাজাতি। অর্থাৎ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য [Unity in Diversity]। এবারের ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের ক্ষেত্রেও সেটি বেশ লক্ষণীয়। আর আমাদের জুমপাহাড় আয়তনে অনেক ছোট হলেও ঐক্যের ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা সেই ভারতীয় সংহতির উদাহরণটিকেই নির্বিঘ্নে গ্রহণ করতে পারি। তাই বন্ধুগণ আসুন, আমরাও আমাদের জাতিগত বৈচিত্র্যের মাঝে সেই মহার্ঘ ঐক্যটিকেই খুঁজি। আর কোনটি ১০০% সঠিক জাতীয়তাবাদ, কোনটি নয় সেটি খুঁজতে গেলে পৃথিবীর সকল জাতির জাতীয়তাবাদের মধ্যেই আপনি অসংখ্য ইঁদুরের গর্ত খুঁজে পাবেন। কারণ, নিরঙ্কুশ বা সঠিক জাতীয়তাবাদ বলতে কোনো বস্তু এই পৃথিবীতে নেই। পৃথিবীর সকল বস্তু, ধারণা, সংজ্ঞা, রূপায়ন কিংবা চেতনা সবকিছুই আসলে আপেক্ষিক। তাই নিজের উদার অন্তঃকরণের সিদ্ধান্তটিই সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে সবার পরম পাথেয় হওয়া উচিৎ।
🍁🍁 অনেকেই হয়তো জানেন না, পার্বত্য পাহাড়ে যখন ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদের’ উত্তুঙ্গ জোয়ার বইছিলো, তখন ভারত, বার্মা এবং ইউরোপ-আমেরিকার চাকমাদের কথা চিন্তা করে, তাঁদের দাবির সাথে একাত্মতা জানিয়ে শ্রদ্ধেয় রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো, শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তে এবং তাঁদের ফরাসি বন্ধু তথা বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী পিয়ের মারচ্যান্ড প্রমুখ জাতিসংঘের আদিবাসী দিবস ও আদিবাসী দশক ঘোষণার সাথে সঙ্গতি রেখে একটি চাকমা জাতীয়তাবাদী বিপ্লব পরিচালনা তথা চাকমাদের সার্বিক রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সোচ্চার হয়েছিলেন। সেইসব অধিকার আদায়ের কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১৯৯৩ সালে তাঁরা কোলকাতায় আন্তর্জাতিক চাকমা সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন এবং সম্মেলন শেষে ওয়ার্ল্ড চাকমা অর্গানাইজেশন [WCO] নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাতিসংঘের পরবর্তী অধিবেশনে চাকমাদের জন্য একটি স্থায়ী পৃথক আবাসভূমির দাবি উত্থাপনও তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য ছিলো বলে আমার ধারণা। কারণ শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তের সেই সময়ের একটি লেখায় তার আভাস রয়েছে বলে মনে করি। তাঁর সেই দীর্ঘ লেখাটির শিরোনাম ‘চাকমা জাতির ভবিষ্যৎ কী’, যা আমি পরে বন্ধুদের সবার সকাশে তুলে ধরার প্রত্যাশা রাখছি। তবে বাংলাদেশের বাঙালি বন্ধুদের এতে বিচলিত, উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামকেই যে চাকমাদের আবাসভূমি হতে হবে, তার কোনো কথা নেই। চাকমারা এখন একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তাই আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, হল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, চীন, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ইত্যাদি যে কোনো দেশেই এখন তাঁরা নিজেদের জন্য স্থায়ী আবাসভূমির দাবি তুলতে পারেন। তবে প্রযোজ্য সব আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন-কানুনের ভিত্তিতেই সেই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, এটাই সারকথা।
🍁🍁 বলাবাহুল্য, শ্রদ্ধেয় রাজগুরু ভান্তে এবং শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তেদের সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে আমাদের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। সম্মেলনে নিজেদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে ভান্তেদের সেসব পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেওয়ার সমূদয় আয়োজন তাঁরা সম্পন্ন করেছিলেন। অথচ যাঁদেরকে তাঁরা সেদিন প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন সেই তাঁরাই আজ পার্টির মহাশত্রু এবং আপদে-বিপদে এখন ভান্তেদেরই সহায়কজন। এমন একটি কাণ্ড রাজনৈতিক নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা, অপরিণামদর্শিতা এবং সামন্তীয় অহঙ্কারের কারণেই ঘটেছে বলে আমি মনে করি [এর বেশি বলা যাবে না]। সে সময় যদি জাতিসংঘের অধিবেশনে পৃথিবীর বুকে চাকমাদের স্থায়ী আবাসভূমির দাবিটি উত্থাপিত হতো, তাহলে সেই দাবি পূরণের লক্ষ্যেই আজ চাকমাদের সমূদয় সংগ্রাম পরিচালিত হতে পারতো। ভিন্ন জাতির কোন সহভ্রাতা কী লিখেছেন, তাঁদের কোন মুরুব্বি আমাদের নিয়ে কী গবেষণা করেছে্ন, সেসব ঠুনকো বিষয়ের ওপর আমাদের জাতিগত পরিচিতি তথা অস্তিত্ব নির্ভর করতো না। তাই এখনো সময় আছে, আমাদের নিজেদের স্ব স্ব জাতিগত শক্তি, সংবেদন, সহমর্মিতা, উদারতা এবং প্রজ্ঞাকে চেনার। সর্বোপরি নিজেদের ঐক্যকে প্রতিষ্ঠিত করার। আসলে চার চারটি দলে বিভক্তির জন্য কিন্তু মারমা, ত্রিপুরাদেরকে মোটেও দায়ী করা যাবে না। এই দায় চাকমাদের। আর এসব মারদাঙ্গা, বিভক্তির কারণে যদি অন্য জাতির লোকজন চাকমাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে সেই দায়ও কিন্তু চাকমাদেরই বহন করা উচিত। যেখানে চাকমা জাতিরই সিংহভাগ মানুষ চলমান রাজনীতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন সেখানে ত্রিপুরা জাতির কেউ যদি “আমরা ত স্বাধীন ন চায়, চাকমারা না চায়” বলে নিজের অবস্থানের জানান দেন, সেটির জন্য কি তাঁকে দায়ী করা যায়? আসলে ‘চাকমা’ রাজনীতির ক্রিয়াকলাপের নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং নিজেদের অন্তর্দর্শন অবশ্যই জরুরি বলে আমিও মনে করি। দেখুন, পাহাড়ি সমাজে শান্তিবাহিনী যখন একক, অবিভাজ্য শক্তি ছিলো তখন কি ত্রিপুরাসহ অন্য জাতির মানুষেরা ‘চাকমা’ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন? তাই সবকিছুর আগে নিজেদের রাজনৈতিক দলসমূহের ঐক্য প্রতিষ্ঠার দিকেই সর্বাধিক মনোযোগী হতে হবে বলে মনে করি। নিজেদের সেই পুরনো ইস্পাত-কঠিন ঐক্যকেই যে কোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। আশা করি, তখন চাকমা এবং অন্য জাতিসত্ত্বার সকলেই ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদের’ পতাকাতলে সামিল হবেন। হয়তোবা অনেকের কাছে আজ ভিলেন হিসেবে গণ্য সেইসব গবেষক, শিক্ষাবিদ, লেখকও সেদিন আরও দ্বিগুণ উৎসাহে জুম্ম জাতীয়তাবাদকেই পাকাপোক্ত, মহিমান্বিত করে তুলবেন!
🍁🍁 আসলে রাজনীতি তথা জাতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে সঠিক সময়েই সঠিক সিদ্ধান্তটিকে গ্রহণ করতে হয়। শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তেরা সেটি বুঝেছিলেন। কিন্তু আঞ্চলিক দলগুলো সময়ের গুরুত্বটি বুঝতে পারেনি। আদিবাসীদের পক্ষে একটি ডামাডোলের এবং সুযোগ লুফে নেওয়ার দশক ছিলো সেটি। সেই ডামাডোলের অল্প কিছুদিনের মধ্যে পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা অর্জন তারই অকাট্য প্রমাণ। আমরা পূর্ব তিমুরের মতো স্বাধীনতা চাই নি বা চাই না। কিন্তু এই ভূ-গোলকের কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার, স্বশাসনের অধিকার অবশ্যই চাই। সে সময় জাতিসংঘের কাছে এই চাওয়া মোটেও অন্যায্য কিছু ছিলো না। প্রসঙ্গক্রমে বলি, চাকমা জাতির ৫০তম রাজা শ্রদ্ধেয় ত্রিদিব রায়ও বিশ্ব চাকমা সম্মেলনের কিছুদিন আগে বা পরে ভারতে, কোলকাতায় এসেছিলেন। তখন এই অধমের সুযোগ ঘটেছিলো তাঁর সাথে কিছু বাতচিতের। পরিচয় পর্ব শেষে তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন মায়নী নদীর তীরে আমাদের পরিবারের সেই পুরনো বাংলো বাড়িটা এখনো আছে কিনা, যেখানে তিনি বহুবার, বহুদিন অবস্থান করেছিলেন [রাজ্যপাট পরিদর্শনে গিয়ে]। সেসব আমার আজুর আমলের ঘটনা, যা আমি নানুর কাছে বহুবার শুনেছি। তবে আমি চাকমা জাতির ব্যাপারে তাঁর একটি জোরালো দাবি বা আকাঙ্খার প্রকাশ দেখে বিস্মিত হয়েছি বৈকি! পাকিস্তানের কূটনীতিকের পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে এসে কোনোরূপ রাখঢাক ছাড়াই তিনি দাবি করছেন চাকমাদের জন্য অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমির প্রয়োজন [শ্রদ্ধেয় বিমল ভান্তেদের দাবির অনুরূপ]। ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক মানস রায়কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন [The Telegraph/Statesman], ইরাকের কুর্দিরা যদি আলাদা রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে পারে, তাহলে চাকমারা নয় কেন? আমার তো মনে হয়, এমন দাবি তোলার সাহস বা স্বপ্ন পাহাড়ের কোনো রাজনৈতিক দলের কখনো হয় নি। ভবিষ্যতেও হবে কিনা সন্দেহ।
🍁🍁 মূল কথা হলো, আমরা নিজেদের দোষেই অনেক সুযোগ হেলায় হারিয়েছি। এখন সহজাতির কারও সামান্য কিছু লেখালেখি বা কটু মন্তব্যের জন্য তাঁদেরকে দোষ দিয়েই বা লাভ কী? আরও বড়ো বিষয় হলো, জুম্ম জাতীয় মুক্তির সমগ্র বিষয়টিকে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা দরকার। যদি ভাবি যে জাতিসংঘের কিংবা বৈশ্বিক শক্তিসমূহের সহযোগিতা ছাড়াই নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, কাঁধে কয়েকটি থুম্বুক ঝুলিয়ে মস্তানি-চাঁদাবাজি করে, ত্রিপুরা-মারমাদের সাথে জ্ঞানতাত্ত্বিক তর্কে লিপ্ত হয়ে এবং রাজপথের পদযাত্রায় কয়েকটি অনলবর্ষী শ্লোগান মেরে জুম্মদের জাতীয় মুক্তি আসবে, তাহলে অধমের বলার কিছুই নেই। এই জাতীয় চীনপন্থী সমাজতন্ত্রের আদর্শকে অনুকরণ করতে গিয়েই আসলে আমাদের বারোটা বেজেছে বলে মনে করি [যার দায় এদেশের বাঙালি সমাজতন্ত্রীরাও এড়াতে পারবেন না। কারণ, তাঁরাই মূলত পাহাড়িদেরকে এইবিধ সহিংস, হন্তারক সমাজতন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন]। এইসব আধাখেঁচড়া সমাজতান্ত্রিক চর্চা [যা আসলে বেনেভোলেন্ট, সামন্তীয় ডিক্টেটরশিপ ছাড়া কিছুই নয়] পরিহার করতে না পারলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি দিনদিন আরও সঙ্কুচিত হতেই থাকবে। আমরা দিনদিন আরও প্রবলভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে হন্তারক ভূমিকায় অবতীর্ণ হবো। তাই প্রয়োজন উদারতার, তথাগত বুদ্ধের অহিংসা, মধ্যমপন্থা অনুশীলনের এবং আত্মজিজ্ঞাসার [নিজেদের মাধাফেঝা খতিয়ে দেখে ঝেড়ে-মুছে ফেলার]। নিজেদের মধ্যে সহিংস সমাজতন্ত্রের চর্চা করতে গিয়ে আমরা ইতিমধ্যে জুম্ম সমাজের অনেক অন্তর্দৃষ্টি, সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছি। যেমন ধরুন, আজকের সাজেকের রূপটি যে এদেশে পরিকল্পিত হয়নি, সেটি বললে আমাদের অঘারা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবেন না। ঠিক তেমনি কথিত চীনপন্থী সমাজতন্ত্র আমাদের জুম্ম সমাজকে দশকের পর দশক ধরে অথর্ব বানিয়ে রেখেছে। কীভাবে জাতির এই বিশাল ক্ষতিসাধন সম্পন্ন হচ্ছে, সেটি উপলব্ধি করার জন্য প্লিজ লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস এর স্বনামধন্য অধ্যাপক ডঃ আজিজুর রহমান খানের ‘আমার সমাজতন্ত্র’ বইটি পড়ে দেখুন। নির্মম সত্য হলো, এই মহামান্য এবং স্পর্শকাতর সমাজতান্ত্রিক চর্চার কারণেই তো জুম্মরা শত বছর পরেও আজ অবধি ঐক্যবদ্ধ হতে পারলো না। শ্রেণীশত্রু খোঁজার মধ্যেই তাদের সমুদয় মানবিক শক্তি-দক্ষতা, হৃদয়-মন-সংবেদন নিঃশেষিত হয়ে গেলো। শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষের ভালো, শুভময় দিকটি তারা আর কখনোই দেখতে পেলোনা।
🍁🍁 বন্ধুগণ, আসলে আমাদের এখনো অনেক কিছুই করার বাকি আছে। সাহেবদের যে বইগুলো পড়ে প্রশান্তদা আজ সারগর্ভ রচনা লিখছেন, আমাদের অনেকের বিরাগভাজনও হচ্ছেন, সেই সমস্ত বই বাংলায় অনুবাদ করা দরকার। সেটি করা গেলে অনেকেই তাঁর মতো স্বজাতির কল্যাণে কিছু বই লিখতে পারবেন। একবার কোনো এক লেখায় তিনি যেন বলেছিলেন, সাহেবদের পরিবর্তে আমরা যদি এই উপমহাদেশের ইতিহাস নিজেরাই রচনা করতাম, তাহলে আমাদের পরিচিতিও আজ ভিন্নরূপে প্রতিভাত হতো। এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, গত শতাব্দীর সেই নব্বইয়ের দশকে এক কর্নেল যখন পাহাড়-ভূমিকে শাসনে-ত্রাসনে কাঁপিয়ে দিচ্ছিলেন, সে সময় প্রশান্তদা [তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র] কর্নেলের সভা থেকে মাঝপথে বেরিয়ে যাওয়ার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলেন। কারণ কর্নেল মহোদয়টি সেদিন সভা ডেকে অপমানজনকভাবে দিয়াশলাইয়ের কাঠি ছুঁড়ে দিয়ে নির্ধারণ করছিলেন, তার প্রশ্নের উত্তর কোন ‘উপজাতীয়’ ছেলেটি/মেয়েটি দেবে। কর্নেলের ছুঁড়ে দেওয়া দিয়াশলাইয়ের কাঠিটি প্রশান্তদার গায়ে গিয়ে পড়লে তিনি উত্তর না দিয়ে সটান উঠে দাঁড়িয়ে কর্নেলের সভা ত্যাগ করেন। এমনই ছিলেন সেদিনের সাহসী জুম্ম তরুণ শ্রী প্রশান্ত ত্রিপুরা। আরেকবার ছোটভাই শ্রী সন্তোষ ত্রিপুরার [বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী] গবেষণাকর্ম বিষয়ক সেমিনারে গিয়ে জানলাম, খোদ তাঁর পিতাই নাকি সেটেলার বাঙালিদের হামলায় নিহত হয়েছেন। সন্তোষ সেদিন জুমপাহাড়ে নিজের যাপিত জীবনের/পরিবারের যে মর্মস্পর্শী বয়ান তুলে ধরেছিলেন, তাতে অশ্রু সংবরণ করা সত্যিই কষ্টসাধ্য ছিলো। আর সৌভাগ্যক্রমে প্রশান্তদার স্ত্রী প্রফেসর আইনুন নাহার ম্যাডাম ছিলেন সেদিনের সেমিনারের একজন অন্যতম আলোচক। অর্থাৎ মূল বিষয়টি হলো, আমাদের প্রাণপ্রিয় জুমপাহাড়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন-বৈষম্য-অনাচার-অবিচারের শিকার কিন্তু সকল পাহাড়ি জাতিই। এক্ষেত্রে চাকমা এবং ত্রিপুরাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু অভিন্ন। তাই তুচ্ছ বিষয়-আসয় তথা বিভেদ নয়, ঐক্য-সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে পাহাড়ের জাতিসমূহের এই অভিন্ন অভিজ্ঞতাগুলোর ওপরই জোরারোপ করতে হবে। আর এভাবেই একদিন আমরা সম্মিলিতভাবে নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।
🍁🍁 এখন কিছু বিষয়ে ঐক্যমত্য দরকার। (১) জুমপাহাড় বিষয়ে ঔপনিবেশিক শাসনামলের সব বই/দলিলপত্র বাংলায় অনুবাদ করতে হবে (২) জাতি-শ্রেণি-ধর্ম নির্বিশেষে জুমপাহাড়ের সবাইকে নিয়ে ঐক্য সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে (৩) সকল আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য, সংহতি জোরদার করতে হবে (৪) পাহাড়ের সকল জাতি নিজেদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য স্ব স্ব জাতিগত সংগঠন গড়ে তুলুক, তবে রাষ্ট্রের সাথে দেন-দরবারের ক্ষেত্রে তাঁদের সবাই একই জুম্ম জাতীয়তাবাদের ছায়াতলে সম্মিলিত হোক (৫) বিশেষ একটি জাতির কতিপয়জন অন্য একটি জাতিকে সমালোচনা করছে বলে সেই জাতির সবকিছু শেষ হয়ে গেলো এমন ভাবার কারণ নেই (৬) জাতিগত সংগঠনগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বজাতির উন্নয়নের জন্যই গড়ে উঠুক, কারো/কোনো জনগোষ্ঠীর বিশেষ উস্কানির কারণে নয় (৭) দলীয় স্বার্থ নয়, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের বোধই হোক এইসব সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি (৮) এসব সংগঠনের ঐক্য, সংহতি সুদৃঢ়করণের জন্য স্ব স্ব সার্কেলের রাজাসহ সমাজের/রাজনীতির গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে সম্পৃক্ত করা হোক (৯) শুধুমাত্র জুমপাহাড়ের সীমারেখার মধ্যে নয়, পার্বত্য পরিস্থিতির যথাযথ সমাধানের জন্য আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ভূ-রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়াসহ বৈশ্বিক পরিসরে সমস্যাটিকে উপস্থাপন এবং তার আউটকাম ফলোআপ করা হোক (১০) আলোচ্য বিষয়ে ইতিপূর্বে যাঁরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদেরকে সম্পৃক্ত করা হোক এবং তাঁদের মূল্যবান মতামত, পরামর্শ সাদরে বিবেচিত হোক।
🍁🍁 বন্ধুগণ, উপরোক্ত সকল বিষয়ের সাথে কিছুটা সঙ্গতিপূর্ণ আমার নিচের লেখাটি প্লিজ পরে দেখুন অথবা এড়িয়ে চলুন। তবে চাকমা ভিন্ন অন্য জাতির বন্ধুগণ, অনুগ্রহপূর্বক লেখককে ভুল বুঝবেন না। কারণ এই লেখার মূল টার্গেট আপনারা নন। এখানে এস্ট্যাব্লিশমেন্টই আসলে লেখকের সমালোচনার মূল লক্ষ্যবস্তু।
কেন চাকমা জনগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে টার্গেট করা হচ্ছে?
🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂🍂
🍂🍂 বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি নানা মহল, অভিজাত ও সাধারণ লোকজনের কথাবার্তায় আজকাল চাকমা বিদ্বেষী এবং ঈর্ষাকাতর বহু বক্তব্য শোনা যায়। দুই দশক আগেও যে চাকমা জাতি সম্পর্কে সাধারণ বাঙালি মানসে উপজাতি, আদিম, বর্বর হিসেবে একধরনের তাচ্ছিল্যের আসন পাকাপোক্ত ছিল সেই চাকমারা কোন জাদুমন্ত্রবলে আজ এতোখানি (বাঙাল-বিবেচনায়) উন্নত, সভ্য হয়ে গেল তা বোধগম্য নয়। কারণ চাকমাদের জন্য কোটার প্রয়োজন নেই এমন দাবিও এখন শোনা যাচ্ছে। [আর এখন তো সেই কোটা পদ্ধতিটাই বাতিল করা হয়েছে – নতুন সংযোজন]। আসলে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ তথা নিঃস্বায়নের জন্য যে নয়া-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় প্রকল্প এদেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার প্রেক্ষিতে নতুন ও সুক্ষ এই ষড়যন্ত্রের তৎপরতাগুলোকে বুঝতে হবে। বলাবাহুল্য, নানা ভ্রান্ত সমীকরণ ও স্বার্থদ্বন্দ্বে দল-উপদলে বিভক্ত বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সমাজে চাকমারা এতোদিন সত্যিই তাদের ব্যতিক্রমী একীভূত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম স্বাধিকারের সংগ্রাম একসময় মুকুলিত হতে পেরেছিল। এই সংগ্রাম আজও বাংলাদেশের সকল মুক্তিকামী আদিবাসী, এমনকি বহু প্রগতিশীল বাঙালির কাছেও আরাধ্য সম্পদ। বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীগত বিপ্লবের ইতিহাসেও জুম্মদের বিদ্রোহ একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সে কারণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহী জনসংহতি সমিতির সাথে চুক্তিতে উপনীত হওয়ার পর ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। নানা আঞ্চলিক দল উপদলে বিভক্ত হওয়ার কারণে পার্বত্য আদিবাসীদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি এখন কিছুটা ক্ষুন্ন হলেও জাতিগত শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ দেশে বিদেশে স্বীকৃত ও প্রসংশিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আদিবাসী জুম্মদের এই সংগ্রামকে, সংগ্রামের গৌরবময় অর্জনকে কেন আজ চাকমাদের বাড়বাড়ন্ত বা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার আয়োজন চলছে? এর পেছনের রাজনীতিকে অবশ্যই আমাদের বুঝতে হবে, উপরে আলোচিত মায়োপীয় রাষ্ট্রীয় দর্শনের আলোকে।
🍂🍂 এই বঙ্গদেশসহ ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন প্রায় দু’শ বছর ধরে বহাল ছিল। সেই দীর্ঘ শাসনামলে ব্রিটিশরা চাকমা জাতিকে খ্রিস্টধর্মে দিক্ষিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সফল হতে পারে নি। লুসাই/মিজো, গারো, নাগা, খাসি, সান্তালসহ বাংলাদেশ এবং অবিভক্ত ভারতের অনেক জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে অতি সহজে তারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে সক্ষম হয়েছে। চাকমা জাতির ক্ষেত্রে কেন তারা সফল হতে পারে নি সেটি নির্মোহ দৃষ্টিতে বিবেচনার দাবি রাখে। ছোটবেলায় মিজো জাতির মানুষকে খ্রিস্টধর্মের অনুগামী করার জন্য ব্রিটিশ সেনাপতিকে কি ধরনের কুটকৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছিল তার গল্প গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শুনেছি। ব্রিটিশ সেনাপতি মিজো সমাজের ‘লালফা’র হাতে তার গুলিভর্তি রাইফেল [আসলে বারুদ ছাড়া সেখানে কোন গুলি ছিল না] তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘চালাও, আমাকে গুলি করো।’ সেই ‘লালফা’ দেখলেন, একের পর এক জলজ্যান্ত গুলি ছোঁড়ার পরেও ব্রিটিশ সেনা কুপোকাত হয় না; শুধু যীশু, গড ইত্যাদি শব্দ বলে ধ্যানস্থ হয়ে যায়। এভাবেই হয়তো ব্রিটিশরা তাদের নানা চাতুর্যপূর্ণ আধ্যাত্মিক শক্তি জাহির করে একসময় মিজোসহ অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সহজে বশীভূত করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যদিকে চাকমাদের বেলায় ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তারা রীতিমত চারবার যুদ্ধ করেছে। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ তো অনেক দূরের ব্যাপার। গ্রামের বয়স্কদের মুখে শোনা একটি গল্প বলি। খ্রিস্টীয় যাজকদের প্রচারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে চাকমাদের কেউ কেউ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। যেদিন তাদের দীক্ষা হয় ঠিক তার পরের দিন মলিন মুখে বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে কিংবা গৃহের একপাশে সযতনে রাখা বুদ্ধমূর্তির সামনে আনত হয়ে তাদেরকে প্রার্থনা করতে শোনা যায়, ‘হে পরম করুণাময় বুদ্ধ, তুমি আমায় ক্ষমা করো; আমি দারিদ্রের কারণে, নানা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার অভিনয় করেছি, সাময়িক এই বিচ্যুতির জন্য আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমাকে পুনরায় গ্রহণ করো’ ইত্যাদি। এই হলো চাকমাদের ধর্মবিশ্বাস, যা তাদের উৎপত্তির ইতিহাসের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। চাকমাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, তারা মহামানব গৌতম বুদ্ধের বংশধর। এই অকৃত্রিম বিশ্বাসই হয়তো ধর্মীয় নানা প্রচারণা ও প্রলোভনের এই যুগে তাদেরকে এখনও গৌতম বুদ্ধের গোঁড়া অনুসারী হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। [সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সমাজের কিছু হতদরিদ্র ব্যক্তির ইসলাম ধর্ম গ্রহণের খবর ও ছবি আন্তর্জালে বেশ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এই ক্ষেত্রেও চাকমাদের ধর্মান্তর পরবর্তী স্বধর্মে প্রত্যাবর্তনের পূর্বোক্ত দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি ঘটে কিনা, সে বিষয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। তবে হ্যাঁ, বর্তমানে অনুসৃত ‘দান-শীল-ভাবনা’ নির্ভর হীনযানের পরিবর্তে পার্বত্য অঞ্চলে মহাযান বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক অনুশীলন ও প্রসার ঘটলে এবং বিশ্বের উল্লেখযোগ্য মহাযানী বৌদ্ধ মঠ ও রাষ্ট্রগুলোকে সম্পৃক্ত করা গেলে পাহাড়ি মানুষের স্বধর্ম ত্যাগের এই প্রবণতা পুরোপুরি নিবারণ করা যাবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস। পার্বত্য সচেতন বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু পারিষদমণ্ডলী গভীরভাবে ভেবে এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন - নতুন সংযোজন]।
🍂🍂 ধর্মবিশ্বাসে গোঁড়া বৌদ্ধ এই জাতিসত্তা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী পশ্চিমাদের পাল্লায় পড়ে পার্বত্য অঞ্চলে খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় লালায়িত হবে, এমন কল্পনা শুধুমাত্র অপ্রকৃতিষ্ঠ মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আর ১৩০ কোটি মানুষের পরাশক্তিধর রাষ্ট্র ‘হিন্দু’ ভারত নিজের নাকের ডগায় এ ধরনের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেবে, সেটি মেনে নেওয়াও পাগল ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। বিশেষ করে যেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অপরাধে ভারতের কোন কোন অঞ্চলে এখনও যাজকদেরকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে। তাছাড়া পরমাণু বোমাকে কি পশ্চিমের উন্নত খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলো ভয় পায়না? তবে হ্যাঁ, চাকমা জাতির অধিকাংশ মানুষ এখনও নিজেদেরকে হাজার বছরের ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী মনে করে। তাদের কাছে পরম পবিত্র বৌদ্ধ তীর্থগুলোর অধিকাংশ ভারত ভূখণ্ডে পড়েছে। কয়েকটি পড়েছে নেপালে ও ভুটানে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে কিছু জগদ্বিখ্যাত বৌদ্ধ-তীর্থস্থান থাকলেও বাস্তব কারণে জুম্ম বৌদ্ধরা সেসব পরিদর্শনে যেতে তেমন আগ্রহী নন। চাকমাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম, অরুণাচল, মেঘালয়, দিল্লী এবং পশ্চিমবঙ্গেও অবস্থান করছেন। মিজোরামে তো পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদের চেয়েও শক্তিশালী একটি স্ব-শাসিত চাকমা জেলা পরিষদ আছে, যার বাজেট ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সরাসরি বরাদ্ধ দেওয়া হয় [যদিও রাজ্য সরকার সেটি হস্তান্তর করে]। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী থেকে শুরু করে সময় সুযোগমতো রাষ্ট্রের রথী-মহারথীদের চাকমা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল পরিদর্শনের রেওয়াজ আছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তো একবার মিজোরামের রাজধানী আইজল থেকে নিজে ড্রাইভ করে শত শত মাইলের সর্পিল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে চাকমা ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলে পৌঁছেছিলেন বলে প্রচার আছে। আর চাকমা রমণীদের সাথে ঐতিহ্যবাহী পিনোন-হাদি পড়ে দাপুটে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর পুত্রবধু [বর্তমানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী] সোনিয়া গান্ধীর তোলা সেই উজ্জ্বল ছবিগুলো তো আজ ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশের বর্তমান ও প্রাক্তন দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সাথে অনুরূপ হৃদ্যতাপূর্ণ মেলামেশার সুযোগ এদেশের চাকমা বা অন্যান্য আদিবাসীদের ভাগ্যে কখনো কি জুটেছে বা জুটবে? তাছাড়া মিজোরামে রাজ্য সরকারের মন্ত্রীসভায় একজন চাকমা জনপ্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার রেওয়াজ বহুদিন ধরে প্রচলিত আছে। ভারত ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, জাপান, কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বহু চাকমা বসতি গেড়েছেন। দেশে বিদেশে চাকমাদের এই অবস্থানের কারণেই কি বাংলাদেশের কোন কোন কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী চাকমাদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের, কল্পিত বিচ্ছিন্নতাবাদের ধুয়ো তুলছে? বাঙালিরাও তো পৃথিবীর বহু দেশে যুগ যুগ ধরে অবস্থান করছেন। তাহলে একই যুক্তিতে তারাও কি বিচ্ছিন্নতাবাদী, দেশদ্রোহী?
🍂🍂 যাই হোক, নিজেদের সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও রাষ্ট্রীয় বৈরিতাকে মোকাবিলা করে মূলত চাকমাদের নেতৃত্বে [অবশ্য মারমা, ত্রিপুরা নেতৃবৃন্দও ছিলেন] একটি সুসংগঠিত গেরিলা বিদ্রোহ পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত হয়েছে, যার সফল সমাপ্তি ঘটে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সাথে সম্পাদিত ‘শান্তিচুক্তি’র মাধ্যমে। এই বিদ্রোহের সূত্রে পৃথিবীর নানা দেশে চাকমাদের বহু শুভানুধ্যায়ী, বন্ধু-স্বজন বা সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে যা তাদের গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার দক্ষতা এবং বর্তমান পৃথিবীতে আধুনিক জাতি হিসেবে তাদের গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, যোগাযোগ দক্ষতা ও কূটনৈতিক সামর্থ্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। এখন বাংলাদেশে বাঙালিদের পরে চাকমারাই অন্যতম প্রধান জাতি যারা আজ পৃথিবী জুড়ে সুপরিচিত। শোনা যায়, ভারতের মিজো, নাগা, খাসি, অহমিয়া বা মনিপুরী প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর কাছেও বিশ্বজুড়ে চাকমাদের এই ব্যাপক পরিচিতি নাকি একটি বিস্ময়। তাঁদের অনেকে সেই প্রশ্ন করে থাকেন। কারণ এসব জাতিসত্তার নিজেদের নামে স্বতন্ত্র রাজ্য এবং বৃহৎ জনসংখ্যা থাকলেও রাজ্যপাটহীন চাকমাদের নামই নাকি বাইরের জগতে বেশি শোনা যায়। অথচ এদেশে চাকমারাসহ প্রায় ৪৫টি অ-বাঙালি হতভাগ্য জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি পর্যন্ত আজও মেলেনি। সাংবিধানিক এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে যিনি সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদে দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তিনি চাকমা জাতি থেকে নির্বাচিত পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা প্রয়াত শ্রী এম. এন. লারমা, যাঁর নেতৃত্বে পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম আদিবাসীদের স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সূচিত হয়। চাকমাদের এই সংগ্রামী ঐতিহ্য আর ইতোপূর্বে আলোচিত আদিবাসী/সংখ্যালঘু বিদ্বেষী রাষ্ট্রীয় দর্শন ও সার্বভৌমত্ব বিপন্নতার তত্ত্ব সর্বাংশে পরষ্পর বিরোধী। সেকারণে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবশালী ও ভারত বিরোধী অংশটি চাকমা জাতিকে শতধাবিভক্ত করে তার সাংগঠনিক ও সৃজনশীলতার শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে সচেষ্ট বলে নানাবিধ তৎপরতায় প্রতীয়মান হয়। ফলশ্রুতিতে আজ চাকমাদের আঞ্চলিক রাজনীতি ত্রি-ধারায় বিভক্ত [বর্তমানে চার ধারায় - নতুন সংযোজন] এবং তারা প্রবলভাবে পরষ্পরের সশস্ত্র প্রতিপক্ষ। এছাড়া আছে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিভাজন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম দল ও নিরপেক্ষতাবাদীদের হিসেবে ধরলে চাকমা সমাজের রাজনৈতিক শক্তি এখন কমপক্ষে আট থেকে দশ ভাগে খণ্ডিত। তার উপর আছে মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মুরং প্রভৃতি জাতির সাথে চাকমাদের দূরত্ব তৈরির উস্কানিমূলক সরকারি-বেসরকারি তৎপরতা। কারণ এই বিভাজন তৎপরতায় সকল কায়েমি গোষ্ঠীর স্বার্থ নিহিত আছে। চাকমা জাতিকে নিষ্ক্রিয়, নিঃশেষিত করা সম্ভব হলে অন্য জাতিগোষ্ঠীকে বাঙালি জাতির মধ্যে আত্মীকৃত করা সহজতর হবে। ইতোমধ্যে মারমা, ত্রিপুরা [ভারতসহ], তঞ্চঙ্গ্যা, রাজবংশী প্রভৃতি জাতিসত্তা নাকি চাকমাদের তুলনায় অনেক বেশি বাঙাল-অনুরক্ত বলে নিজেদেরকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। মাঝে মাঝে অনেক বাঙালি জাতীয়তাবাদীর সাথে আলোচনায় এমন অভিমতই উঠে আসে। আসলে চাকমা বিলুপ্তিকরণ প্রকল্প সফল হলে আখেরে অন্য কোন আদিবাসী জাতিই আদৌ লাভবান হবে না। সরকারি-বেসরকারি নানা প্রচারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সেই চরম সত্যটি আজ আমরা যেন বুঝতে অক্ষম। কারণ রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারকদের চিন্তায় যতদিন পর্যন্ত হিন্দু ভারত, বৌদ্ধ মিয়ানমার এবং খ্রিস্টান পাশ্চাত্যের জুজুর ভয়সহ আত্মকেন্দ্রিক মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শন কাজ করবে, ততদিন পর্যন্ত কোন আদিবাসী বা সংখ্যালঘু জাতির পক্ষে আত্মপরিচয় ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে এদেশে বসবাস সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এযাবৎ আদিবাসীদের উপর আক্রমণ বা ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটেছে তার শিকার শুধু চাকমারাই হননি; মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, গারোসহ প্রায় সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীই এই তালিকায় রয়েছেন। অবশ্য বিশ্বের ক্রমপরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি এবং ভারত, চীন, পাকিস্তান, ইরান, মিয়ানমার, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের প্রভাবে এই ভূখণ্ডের রাজনীতিতে আদিবাসীদের পক্ষে নাটকীয় কোন পরিবর্তন ঘটলে সেটি ভিন্ন কথা। তবে নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ শক্তি, সৎ চারিত্র্য, বাস্তবতাবোধ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা গড়ে না উঠলে এই অঞ্চল তথা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কোন সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারবোনা।
জগতের সবার মঙ্গল হোক। 🌹🌹🌹🙏🙏🙏
ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

No comments:
Post a Comment