ভারতের নতুন সরকার : কিছু স্মৃতি ও প্রসঙ্গকথা
লিখেছেন :
ধীমান ওয়াংঝা
আজ ৩০ মে ২০১৯। নয়াদিল্লীতে আজকের ৪৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার খরতাপবিদ্ধ উজ্জ্বল সন্ধ্যায় শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীজীর নেতৃত্বে ভারতের নতুন সরকারের মন্ত্রীসভা শপথ গ্রহণ করলো। মোদীজীকে এবং তাঁর নবগঠিত মন্ত্রীসভাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও অভিবাদন জানাই।
ভেবে দেখুন, সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে কী এক অভূতপূর্ব ভূমিধ্বস বিজয় ছিনিয়ে আনলেন শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীজী! আর কী নিদারুণ হার কংগ্রেস, তৃণমূল, টিডিপিসহ অন্যসব বিরোধী দল ও জোটের তরফে! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টি হলো, সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে এগিয়ে থাকা শ্রী চন্দ্রবাবু নাইডুজী খোদ নিজের রাজ্যেই সম্পূর্ণরূপে ধরাশায়ী হয়েছেন। আর অধিকাংশ বিশ্লেষক বলছেন, এই নির্বাচনে অভাবনীয় যে জনরায়, তা আসলে একমাত্র মোদীজীর পক্ষে, মোদীজীকে ভালোবেসেই। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও চিন্তক শ্রী শশী থারুরও সম্প্রতি তাঁর একটি লেখায় প্রকারান্তরে (সারকাষ্টিক্যালি) সেই সত্যকেই মেনে নিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, এই নির্বাচনে মোদীজীর জনপ্রিয়তার মাত্রা নাকি পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীজীর জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমার বিবেচনায়, এবারের নির্বাচনে মোদীজীর একক তথা বিজেপি’র দলগত সাফল্যের পেছনে যেসব কারণ ও রহস্য কাজ করেছে, সেগুলো হলোঃ-
১) শ্রী নরেন্দ্র মোদীজীর তৃণমূলীয় ক্যারিসম্যাটিক ইমেজ, ব্যক্তিগত সততা, নেতাসুলভ বিনয়, প্রজ্ঞা ও সিরিয়াসনেস।
২) বিরোধী জোটের পক্ষে এককভাবে মোদীজীর সমতুল্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করাতে না পারা।
৩) উত্তর, মধ্য ও পূর্ব ভারতের গো-বলয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করতে সফল হওয়া।
৪) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সারজিক্যাল স্ট্রাইক, বিমান হামলা। অতঃপর জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে জনগণের প্রবল সেন্টিমেন্ট তথা দেশপ্রেম জাগ্রত করতে সফলকাম হওয়া।
৫) প্রধানমন্ত্রী মোদীজীর বিরুদ্ধে শ্রী রাহুল গান্ধীজীর আগ্রাসী (কিছুটা অভব্য) প্রচারণা। এখানে উভয়ের বয়েসের পার্থক্যও একটি ফ্যাক্টর। উল্লেখ্য যে, ভারতীয় মূল্যবোধ তথা ভারতের অধিকাংশ মানুষ এখনো বয়সে প্রবীণদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা, সম্মান ও সৌজন্য প্রদর্শনের পক্ষে। রাহুলজী এক্ষেত্রে কিছুটা চপল ও চঞ্চল (স্মরণ করুন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ জাতীয় বক্তব্য)। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূলের আসন সংখ্যার যে অবনমন, তার কারণও বহুলাংশে এটিই। অর্থাৎ তাঁর উগ্র আচরণ এবং ঔদ্দত্য, যা ভারতীয় শালীন সংস্কৃতির সাথে কিছুটা বেমানান। (উল্লেখ্য যে, মমতা ব্যানার্জিও একসময় বিজেপি’র সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন। তখন পশ্চিমবঙ্গের বামদের একটি জনপ্রিয় শ্লোগান ছিলো এ রকমঃ “বিষবৃক্ষে দুই ফুল, বিজেপি ও তৃণমূল।” নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে দাপটের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা সেই বামফ্রন্ট এবারের জাতীয় নির্বাচনে একটি লোকসভা/রাজ্যসভার আসনও ধরে রাখতে পারেনি। আর এককালের মিত্র মমতা ব্যানার্জির সাথে বিজেপি’রও এখন সাপে-নেউলে সম্পর্ক। আগামীতে তাদের এই দ্বন্দ্ব যে সহজে মিটবে এমন কোনো আশা আপাতত নেই)।
৬) বহির্বিশ্বে শ্রী নরেন্দ্র মোদীজীর সাথে বিশ্বনেতাদের সমমর্যাদার সম্পর্ক, যা রাহুলজীর ক্ষেত্রে প্রায় শূন্য।
৭) রান্নার গ্যাস সরবরাহ, মোবাইল ফোন সুবিধা, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে ক্ষুদ্রাকৃতির আর্থিক পরিষেবা ইত্যাদি প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ভোটারদের মন জয় করতে সক্ষম হওয়া। উল্লেখ্য যে, এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক নারী ভোটার বিজেপি’র পক্ষে ভোট দিয়েছেন। উচ্চ-নীচ শ্রেণিভেদ ভুলে বিজেপি’র পক্ষে সকল শ্রেণির মানুষের সমর্থন দান এবারের ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এমনকি কিছু কিছু আসনে মুসলমানরা দল বেঁধে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।
৮) জাতীয় নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তিসহ ভবিষ্যতমুখী এবং উচ্চাভিলাষী নানান খাতে অমিত সম্ভাবনার প্রতি আস্থাশীল করে তুলে নতুন প্রজন্মের প্রায় ১০ কোটি ভোটারের মন জয় করতে সফল হওয়া।
৯) পাকিস্তানী জঙ্গি নেতা মাসুদ আজহারকে প্রায় দুই দশকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার পর জাতিসংঘের সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সফলকাম হওয়া। এক্ষেত্রে চীনের সাথে মারমুখী ডোক্লাম কাণ্ডের পরও ভারতের কূটনীতিতে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হওয়া।
১০) সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শ্রেণি-শত্রুতার বদলে কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি বাস্তবায়নে আরও সচেতন ও দায়িত্ত্বশীল ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে পুঁজিপতিদেরকে দারিদ্র্য নিরসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে এবং তাদের আস্থা অর্জনে সফল হওয়া। এটি মোদীজীর একটি নতুন অর্থনৈতিক দর্শনও বটে।
১১) বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং অন্য প্রতিবেশি দেশগুলো থেকে ভারতে অনুপ্রবেশকারী অবৈধ অভিবাসীদেরকে বিতাড়নের প্রতিশ্রুতিসহ অন্যান্য বহুবিধ (আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক) কারণ।
এখন রাজনীতির বাইরে গিয়ে ভারত প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতির কথা বলি। এইচ এস সি পরীক্ষা শেষে একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম, ভারত ভ্রমণে যাবো। ভ্রমণ ভিসা সংগ্রহ করতে গিয়ে হাইকমিশনের ভিসা অফিসার মিঃ মুখার্জির সাথে পরিচয়। তিনি পরামর্শ দিলেন, আমি ভারতে পড়াশুনো করলে নাকি অনেক লাভবান হবো। কারণ, এদেশের চলমান সেশনজট থেকে বাঁচবো। সেক্ষেত্রে তিনি ভর্তি সংক্রান্ত সহযোগিতা দিতে পারবেন। পরে স্কলারশিপের সুযোগও হয়তো মিলতে পারে, যদি উদ্বৃত্ত কোনো স্কলারশিপ থেকে থাকে। যাক, আমি তাঁর পরামর্শ মতো একদিন হাইকমিশনের একটি চিঠি নিয়ে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট স্টিফেন কলেজে গিয়ে হাজির হলাম। সেটি নাকি দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম্বার ওয়ান কলেজ। অফিসে ঢুকে আমার সেকেন্ড ডিভিশনের রেজাল্টশিট দাখিল করলাম ভর্তি বিষয়ক কাউন্সেলরের কাছে। তিনি সবকিছু দেখেশুনে আমাকে পালি ও সংস্কৃত বিভাগের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠালেন। চেয়ারম্যান বললেন, তোমাকে এই কলেজে পড়তে হলে আমার ডিপার্টমেন্টেই ভর্তি হতে হবে। সমস্যা নেই, এখানে অনেকেই পড়ে। দেখবে, তোমার পাশের রুমেই রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা (গান্ধী) ক্লাশ করছে। কারণ, গত কিছুদিন আগে তারা এখানে ভর্তি হয়েছে। আরও অনেককে সহপাঠী, ব্যাচমেট হিসেবে পাবে। তোমার ভালোই লাগবে। কাল সব প্রস্তুতি নিয়ে সকাল এগারোটার মধ্যে এসো, ভর্তির সব কাজ সেরে ফেলবো। আমার তখন ১৯/২০ বছরের তরুণ বয়স। কে প্রিয়াঙ্কা, কে রাহুল তা ভাবার সময় নেই। আমার লক্ষ্য ফিলসফি সাবজেক্টটিতে ভর্তি হওয়া। মার্কস কম বলে সেন্ট স্টিফেন কলেজে যেহেতু কাঙ্খিত সাবজেক্টটি পাওয়া সম্ভব নয়, তাই আবোলতাবোল কিছু বলে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে পরে সেন্ট্রাল ক্যাম্পাসভুক্ত জাকির হোসেন কলেজে ভর্তি হলাম। এখন পরিণত বয়েসে পৌঁছে ভাবি, কী বোকাই না ছিলাম তখন! অন্তত প্রিয়াঙ্কার সাথে কিছুটা সখ্য গড়তে পারলেই তো এখন জুম্মদের জন্য কেল্লা ফতে না হোক, কিছু উপকার তো হোতোই! আজ ভারতের জাতীয় নির্বাচনে তাদের এহেন বিপর্যয় ও দুঃখের দিনে আমিও হয়তো ই-মেইলে বা টুইট করে তাঁদেরকে সমবেদনা জানাতাম। তাই এখনকার তরুণ–যুবাদের বলি, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত ত্রিশ/চল্লিশ বছরের আগাম চিন্তা মাথায় রাখা উচিত। নিজের ভবিষ্যতের চিন্তার পাশাপাশি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করা উচিত।
যাক, তবুও আজ বলতে দ্বিধা নেই যে, ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেসই ছিলো আমার প্রথম প্রেম। সেটি নানা কারণে। প্রথম কারণ, মহাত্মা গান্ধী আর পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুজীর লেখা কিছু বই স্কুল জীবনেই পড়ে ফেলা। দ্বিতীয় কারণ, নানান ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে এবং কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে পাহাড়িদের/চাকমাদের প্রতি কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের কিছু ইতিবাচক মনোভাব ও ভূমিকা সম্পর্কে অবহিত হওয়া। যেমন, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও তাঁর উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতভুক্ত করতে ব্যর্থ হলেও পরে তাঁরা এবং শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীজী নাকি মিজোরামের চাকমা অটোনোমাস ডিসট্রিক্ট কাউন্সিল গঠনে এবং এর উন্নয়নে প্রভূত ভূমিকা রেখেছিলেন। শুনেছি, শান্তিবাহিনীরা যখন লাম্বা-বাধিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখনও ইন্দিরাজী নাকি পাহাড়িদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী তথা কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক স্বনামধন্য অধ্যাপক প্রয়াত শ্রী শান্তিময় রায় (স্যার) একদিন তাঁর বাসায় কথাপ্রসঙ্গে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালের জুনের মাঝামাঝি তিনি জুম্ম তথা পাহাড়িদেরকে সাহায্য করার কথা উত্থাপন করলে ইন্দিরাজী নাকি বলেছিলেন, “আমি একটি জাতিকে ধ্বংস করার দায়ভার নিতে চাই না। চাকমারা এখন দুই গ্রুপে বিভক্ত। একটি গ্রুপকে সাহায্য করলে অন্য গ্রুপ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ফলে সব দোষ আমার ওপর এসেই বর্তাবে। তারা একতাবদ্ধ হলে সাহায্য করতে সমস্যা নেই।” আমাদের ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে ক্ষয়ক্ষতির, যে জাতিগত বিপন্নতার কথা ভেবে ইন্দিরাজী শান্তিবাহিনীর কোনো একটি উপদলকে সহায়তায় অসম্মত ছিলেন, আজ তাঁরই প্রত্যক্ষ সহায়তায় স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশের নিয়ন্তারা সেই পূর্বতন শান্তিবাহিনীর সদস্য তথা চাকমা/মারমা/ত্রিপুরা/তঞ্চঙ্গা/মুরং প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জুম্ম জাতিকে ৪/৫টি উপদলে বিভক্তির উস্কানিসহ ধ্বংসাত্মক সব সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে মর্মে জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা শোনা যায়। আজ ইন্দিরাজী বেঁচে থাকলে সেটি হয়তো সম্ভব হতো না। উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর মুক্তিযোদ্ধারা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে দিলে ইন্দিরা গান্ধী তৎকালীন চাকমা রাজমাতা শ্রদ্ধেয়া বিনীতা রায়ের অনুরোধে তিব্বতী রেজিমেন্টকে পাহাড়ে পাঠিয়ে জুম্মদেরকে রক্ষা করেছিলেন।
কংগ্রেসের প্রতি আমার দুর্বলতার আরেকটি কারণ সরাসরি সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধী। তারিখটা এখন আর মনে নেই (তবে এর আগের কোনো লেখায় উল্লেখ আছে কিনা খুঁজে দেখতে হবে)। খুব সম্ভবত ১৯৯০ সালের কথা। দিল্লীতে পড়াশুনোর সুবাদে তখন আমরা ক’জন দিল্লীর রাজঘাটের বাসিন্দা। একদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের মং সার্কেলের (খাগড়াছড়ি) রাজা শ্রী রাজীব রায় মহোদয় তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠজনসহ আমাদের রাজঘাটের আস্তানায় এসে হাজির। আমাকে বললেন, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সাথে আমাদের শীঘ্রই দেখা হবে। তিনি পারমিশনের জন্য আমার নামটিসহ চারজনের নাম প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠিয়েছেন। তবে যেদিন পিএম-এর সাথে দেখা করার পারমিশানটি এলো, সেদিন আমার ভীষণ জ্বর। তদুপরি কলেজে আমার ক্লাশ পরীক্ষা। ফলে সেদিন আমাকে রেখে তাঁরা তিনজন দেখা করতে গেলেন। ফিরে এসে উচ্ছ্বসিত ও হাস্যজ্জ্বল রাজা রাজীব রায় মহোদয় জানালেন, সিএইচটি প্রসঙ্গে রাজীব গান্ধী নাকি তাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছেন, ‘প্লিজ গো এহেড। আই এম অলওয়েজ উইথ ইউ।” আর সোনিয়া গান্ধীজীও নাকি চাকমা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পরিধেয় ‘পিনোন-হাদি’ উপহার পেয়ে বেজায় খুশি [মিজোরামের চাকমা অটোনমাস ডিসট্রিক্ট কাউন্সিল (সিএডিসি) পরিদর্শনে গিয়ে তিনি যে ড্রেস পড়েছিলেন, সেটা আমাদেরই বাছাইকৃত সেই পিনোন-হাদি কিনা তা অবশ্য জানি না]। এর দু’দিন পর আমরা যখন বিবিসি-র সাউথ এশিয়া প্রতিনিধি মার্ক টালি’র সাথে দেখা করতে গেলাম, সেখানেও রাজীব রায় মহোদয় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সাথে দেখা হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে পিএম-এর ঐ বিশেষ আশ্বাসবাণীটি তাঁকে শোনালেন। আরও অনেক কাহিনী আছে। লেখাটি লম্বা হয়ে যাচ্ছে বলে সেসব আর লিখছি না। তবে রাজীব গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধীর সাথে সেদিন আমার দেখা না হওয়াটাকে আমি এখন ‘শাপে বর’ জাতীয় ব্যাপার বলে মনে করি। কারণ দেশে ফেরার পর রাজীব রায় মহোদয়ের সেই ভারত-যাত্রা নিয়ে অনেকের কটু, তির্যক, বিতর্কিত মন্তব্য শুনেছি। অবশ্য এসব ব্যাপারে কে সঠিক, কে বেঠিক তা নিরূপণের সাধ্য আমার নেই। আমি শুধুমাত্র একজন স্টুডেন্ট একটিভিস্ট হিসেবে তখন সব্বাইকেই নির্বিচারে সাহায্য করতাম।
তবে একটি ভুলে যাওয়া কবিতার কথা বলে লেখাটির ইতি টানতে চাই। আজ ভারতের নির্বাচন তথা মোদীজীর মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ প্রসঙ্গে রাহুল, প্রিয়াঙ্কার কথা ভেবে আমার সেই কবিতাটির কথা খুব মনে পড়ছে। ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিল এক নারীর (এলটিটিই’র সদস্য) আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে শ্রী রাজীব গান্ধী নিহত হলে সারা ভারত জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সর্বত্র সুনসান নীরবতা। রাস্তায় গাড়ি, ঘোড়া সব বন্ধ। আমরা সেদিন তিনজন (আমি, অধ্যাপক শান্তি কুমার বাবু এবং নাম মনে নেই এমন একজন) দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কোলকাতার সি আর এভিনিউ (ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্স) থেকে বাগুইআটি (আনুমানিক ১০ কিলোমিটার) পর্যন্ত পায়ে হেঁটে গভীর রাতে নিজেদের ডেরায় ফিরলাম। অবস্থা এমনই নিদারুণ ছিলো যে, আমি কবিতা না লিখে পারিনি। পরদিন অবশ্য ‘দেশ’ পত্রিকায় রাজীব গান্ধীকে নিয়ে লেখা কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একটি মর্মস্পর্শী কবিতা পড়েছি। যা’হোক সেদিন রাত্রে আমি কবিতাটি লিখে পরদিন ‘বোধিচরিয়’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক শ্রী কার্তিক দত্ত বনিককে দিয়েছিলাম, তাঁরই অনুরোধে। তবে তিনি ছিলেন একজন নকশালপন্থী ভাবধারার মানুষ (আগে জানতাম না)। তাই আমার কবিতাটি ছাপেন নি, ফেরতও দেন নি। তবুও স্মৃতি থেকে কবিতাটির নীচের কয়েকটি লাইন উদ্ধার করেছি, যা নিম্নরূপঃ
“তোমার ঐ নিটোল, স্মিথ হাসিমুখ
দেশজুড়ে ছড়ানো ভালোবাসা
সদ্ভাবনায় পথ হাঁটা
সবুজ অরণ্যের মতো উচ্ছ্বাসে
আমরা আর দেখবোনা কখনো।
বুকভরা প্রতিশ্রুতি নিয়ে আর মেলবেনা হাত জনতার দিকে –
একুশে মে আজ
এই শোকস্তব্দ রাতে ভারতের রূপ
তোমার প্রিয় স্ত্রী সোনিয়া,
প্রিয় সন্তান রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার
অশ্রুভেজা চোখের মতো।”............
বন্ধুগণ, বাস্তবতা হলো, মোদীজী জিতেছেন এবং কংগ্রেসসহ অন্য সব দল ধরাশায়ী হয়েছে। এখন, আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, ‘বাস্তববাদিতা’। তিন দিক থেকে ঘিরে থাকা প্রতিবেশি রাষ্ট্রটি মাওবাদীদের নিয়ে একপ্রকার ব্যতিব্যস্ত, পর্যুদস্ত। তাই তার আস্থা অর্জন করতে হলে আমাদেরকেও অন্য পথে হাঁটতে হবে। আর সে পথটি বেশ দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। বামপন্থা ছেড়ে দিয়ে বুদ্ধের মধ্যম্পন্থা গ্রহণই এর সমাধান। ভেবে দেখুন, এদেশের প্রথিতযশা রাজনৈতিক দলগুলোর সকলেই কিন্ত ওই পথেই হাঁটছেন। কারণ, প্রতিবেশি একটি নির্মম বাস্তবতা। তাকে বদলানো যায় না।

No comments:
Post a Comment