Thursday, August 15, 2019

ভূস্বর্গ কাশ্মীর এবং অশান্ত জুমপাহাড় : মিল-অমিলের রাজনীতি


লিখেছেন : ধীমান ওয়াংঝা

বন্ধুগণ, কিছুদিন আগে লেখাটি লিখেছিলাম। লিখতে লিখতে অনেক বড়ো হয়ে গেছে বলে আর পোস্ট করিনি। কারণ, দীর্ঘ লেখা অনেকের বিরক্তি উদ্রেক করে। কিন্তু দেখলাম, কাশ্মীর বিষয়ে এখনও অনেকেই বেশ অনুসন্ধিৎসা প্রকাশ করছেন, কখনোবা অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছেন কিংবা জেনে বা না জেনে নানাবিধ মন্তব্য করছেন। তাই সবকিছু দেখে-শুনে আমিও আজ জনস্বার্থে আমার এই দীর্ঘ লেখাটি শেয়ার করতে উদ্বুদ্ধ হলাম। প্লিজ, পড়ে দেখুন। তবে দীর্ঘ লেখা পড়ার ধৈর্য যাঁদের নেই, তাঁরা দয়া করে লেখাটি এড়িয়ে চলুন। সবাইকে অশেষ প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

   
ভূস্বর্গ কাশ্মীর এবং অশান্ত জুমপাহাড়ঃ মিল-অমিলের রাজনীতি

(১)

ভারতের পার্লামেন্টে গত ৬ আগস্ট ২০১৯ জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তথা স্বায়ত্ত্বশাসন রহিতকরণে সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো। পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখ রাজ্যকে ভেঙ্গে জম্মু-কাশ্মীর ইউনিয়ন টেরিটোরি এবং লাদাখ ইউনিয়ন টেরিটোরি নামে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করা হলো। উল্লেখ্য, ইউটি লাদাখের নিজস্ব বিধানসভা থাকবে না, যেমনটি পণ্ডিচেরিরও নেই। তবে জম্মু-কাশ্মীর ইউটি’র জন্য দিল্লীর কেজরিওয়াল সরকারের মতো নিজস্ব বিধানসভা থাকবে। পার্লামেন্টে ৩৭০ ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি বলেছেন যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যথোপযুক্ত সময়ে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে আবারও তার স্ব-মর্যাদা তথা স্টেটহুড ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

তবে আপাতত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেন রদ করা হলো তা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান হুমকি দিয়েছেন, ভারতের এই অবৈধ অনাচার রোধে তাঁর দেশ সম্ভাব্য সবকিছু করবে। সেই লক্ষ্যে তিনি ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, বাহরাইনের বাদশাহ এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সাথেও কথা বলে রেখেছেন। ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রদ করেছেন। ভারতের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছেন। বোঝা যায়, তিনি আইএসআইয়ের কথামতো দায়িত্ব পালন না করলে অচিরেই নিজের চাকরি খোয়াবেন। সেদেশের সেনাপ্রধানও ইতোমধ্যে হুংকার ছেড়েছেন, তাঁর বাহিনী ভারতের বিরুদ্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। ইতোমধ্যে পাকিস্তানীরা রাস্তায় বেড়িয়ে এসে ভারত বিরোধী শ্লোগানে, বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। সৌদি সরকার কাশ্মীর ইস্যুতে জরুরি সভা তলব করেছে। ওআইসি ভারতের পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এদেশেও যে বেসরকারিভাবে হলেও সেরকম কিছু জেহাদি ধুম-ধারাক্কা শীঘ্রই শুরু হবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কারণ, ইতোমধ্যে ফেইসবুকসহ আন্তর্জালের দুনিয়ায় পাকিপন্থী ধর্মভ্রাতাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ-ভীমরতি শুরু হয়ে গেছে। বামপথের বাঙালি ভাই-ব্রাদাররাও নাকি জাগতে শুরু করেছেন। সেই সাথে কিছু জুম্ম ভ্রাতা-ভগ্নীও খানিকটা বিচলিত হয়েছেন মর্মে নজরে আসছে। এহেন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় ও বাম মৌলবাদ কীভাবে যে একপথে মিলে যায়, তা আসলেই বেশ রহস্যজনক ও ব্যাপক গবেষণাযোগ্য একটি বিষয়। অথচ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার যুদ্ধ যদি চূড়ান্ত রূপ নেয়, তাহলে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবে হারবে। চূড়ান্ত পরাজয়ের (অনেকের মতে নিশ্চিহ্ন হওয়ার) আগে সে ভারতের কয়েকটি প্রদেশকেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে। তাই পুলওয়ামা সন্ত্রাসকাণ্ডের পর পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফ পরামর্শ রেখেছিলেন, ভারতকে হারাতে হলে পাকিস্তানকে প্রথম সুযোগেই শত্রুদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একযোগে ৫০টির মতো পরমাণু বোমা ফেলতে হবে। প্রশ্ন হলো, ভারত কি তখন চুপচাপ বসে থাকবে? ফলে চীন, জাতিসংঘসহ পশ্চিমা বিশ্ব এখন উভয় দেশকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের পরামর্শ দিচ্ছেন।

যা হোক, আরও বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে আসুন নিচে একটু দেখে নিই কী কী বিষয় ছিলো ঐ দুই অনুচ্ছেদে, যেসব বাতিলের কারণে আজ ধর্মভ্রাতাদের সমাজে, মনোজগতে ভারত বিরোধী হিস্টিরিয়া দিন দিন চাগিয়ে উঠছে।

অনুচ্ছেদ ৩৭০

• এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, বিদেশ, অর্থ এবং যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে জম্মু-কাশ্মীরে হস্তক্ষেপের অধিকার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নেই।
• জম্মু-কাশ্মীরের জন্য কোনও আইন প্রণয়ন করতে হলে রাজ্যের সম্মতি নিতে হবে।
• জম্মু-কাশ্মীরের জন্য আলাদা পতাকা ও আলাদা জাতীয় সঙ্গীত থাকবে।
• কেন্দ্রীয় সরকার এখানে সাধারণ ও আর্থিক জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবেনা।
• ভারতের তথ্য অধিকার আইনটি এই রাজ্যে প্রয়োগ করা যাবে না।
• অন্য সব রাজ্যে ৫ বৎসর হলেও জম্মু-কাশ্মীরে বিধানসভার মেয়াদ ৬ বৎসর।

অনুচ্ছেদ ৩৫এ 

• এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা বিশেষ সুবিধা পাবেন।
• সংখ্যালঘুদের (হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-অন্যান্য) জন্য কোনো সংরক্ষণ বা কোটা থাকবে না।
• এই প্রদেশের কারা স্থায়ী বাসিন্দা, তা জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভাই নির্ধারণ করবে।
• স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ কাশ্মীরে জমি কিনতে, চাকরির আবেদন করতে এবং ভোট দিতে পারবেন না।
• রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা কোনও নারী বাইরের কাউকে বিয়ে করলে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। এমনকি তাঁর উত্তরসূরিরাও ওই সম্পত্তির অধিকার বা মালিকানা পাবেন না।

এবার আসুন, এক নজরে দেখে নিই ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি বা রেগুলেশনে কী কী বিষয় ছিলো, যার কারণে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জম্মু-কাশ্মীরের মতো বিশেষ অঞ্চলের মর্যাদা ভোগ করতো।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন, ১৯০০

• এই রেগুলেশনমতে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি শাসন বহির্ভূত অঞ্চল হিসেবে গণ্য হবে।
• অর্থাৎ এই অঞ্চল স্থানীয় জনগণের বিশেষ প্রথাগত শাসনাধীনে পরিচালিত হবে, যদিও সরকার নিযুক্ত ডেপুটি কমিশনার বাহ্যত এর তদারকি করবেন।
• পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত রাজা/রানীরা ডেপুটি কমিশনারের উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করবেন। 
• তাঁরা স্থানীয় ভূমি-বন ব্যবস্থাপনা, কর আদায়, জননিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা বিধান, প্রথাগত বিচারকার্য পরিচালনা প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করবেন।
• ডেপুটি কমিশনারের বিশেষ অনুমতি ব্যতিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা নন এমন কেউ এই অঞ্চলে প্রবেশ, জমি ক্রয় কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন না।
• শান্তি-শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে হলে ডেপুটি কমিশনার যে কোনো বহিরাগত (অনুমতিপ্রাপ্ত/বাঙালি) ব্যক্তিকে অনতিবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বহিষ্কার করতে পারবেন।
• স্থানীয় পাহাড়ি/আদিবাসীরা জেলা কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নিজেদের হেফাজতে আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে এবং বহন করতে পারবেন।
• জন-শৃঙ্খলা রক্ষাসহ রাজা/রানীর নিরাপত্তা বিধানে এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনগণের মধ্য থেকে নিয়োগকৃত পুলিশ বাহিনী নিয়োজিত থাকবে।
• স্থানীয় জনগণের প্রথাগত সম্পদ, ভূমি-বনের মালিকানা, প্রথাগত জীবন পদ্ধতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে, প্রভৃতি।

(২)

বন্ধুগণ, কাশ্মীরের নিজস্ব বিধানসভা, নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত, পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের সমর্থন-সহযোগিতা, তুলনামূলক বিপুল জনসংখ্যা এবং ব্যাপক ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগসহ বহিরাঙ্গিক কিছু আড়ম্বরের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তুলনায় কাশ্মীর অঞ্চলটি বরাবরই বহির্বিশ্বের আত্যন্তিক আলোচনা ও নজরদারিতে ছিলো, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবুও উপরের তথ্যাবলী থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে কাশ্মীরের মুসলমানরা এবং তারও আগে থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণ মূলত একই ধরনের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর পাহাড়ি আদিবাসীরা আরেকবার ভয়াবহ দুর্ভাগ্যের শিকার হন। সেটি হলো, ১৯৬২ সালে চীন সফরের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চট্টগ্রামের কট্টরপন্থী বাঙালি মুসলিম লীগার ফজলুল কাদের চৌধুরীকে একদিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে রেখে যান। আর এই একদিনের সুযোগেই ফকা চৌধুরী পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘বিশেষ অঞ্চলের’ মর্যাদা বাতিল করে দেন। উল্লেখ্য, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার এবং ফাঁসি-দণ্ডিত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জনক। তাঁর এই পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সংবিধান আইনের (প্রথম সংশোধনী) মাধ্যমে অসাংবিধানিকভাবে অর্থাৎ স্থানীয় জনগণের আবশ্যকীয় সম্মতি ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে রাষ্ট্রটির বিশেষ অঞ্চলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। অথচ, তার আগ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘বিশেষ অঞ্চলের’ মর্যাদায় ঢাকা থেকে নয়, সরাসরি লাহোর থেকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের কাশ্মীর ও সীমান্ত অঞ্চল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে শাসিত হতো। সব মিলিয়ে সেটিও দীর্ঘ প্রায় ২৪টি বছরের শাসনেতিহাস। পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও মহাফেজখানায় সংরক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দলিল-দস্তাবেজ, তথ্য-উপাত্তগুলো সংগ্রহ করা গেলে অনেক গোপনীয়, আকর্ষণীয় ইতিহাস হয়তো উদ্ঘাতিত হতো। হয়তোবা এটিও প্রমাণিত হতো যে, চাকমা জাতির ৫০তম মহামান্য রাজা ত্রিদিব রায় তখন নিজের জন্য নয়, বরং তাঁর সাধারণ জনগণকে যুগপৎ আদিবাসী বিদ্বেষী বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিসেনাদের হাতে কচুকাটা হওয়ার নৃশংসতা থেকে রক্ষার জন্যই পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনে বাধ্য হয়েছিলেন। একই কারণে মহামান্য বোমাং রাজা বাধ্য হয়েছিলেন নিষ্ক্রিয়, নিরপেক্ষ থাকতে আর একই বংশের মং সার্কেলের রাজা মহোদয় নিজের সবকিছু দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে। কারণ, বাঙালি সমাজে বিরাজিত বহুকালের জাতিভেদ প্রথা (হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে), পাহাড়ি-বৈরী বর্ণবাদ ও শভিনিজম মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে যে বাঙালি সমাজ-মানস থেকে একেবারে উবে গিয়েছিলো, সেকথা গ্যারান্টি দিয়ে কেউ বলতে পারবেন না। এসব বিষয়কে সামগ্রিকভাবে না দেখে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা নিয়ে আজও আমরা অনেকেই হম্বিতম্বি, হাহুতাশ করি। কিন্তু বাস্তবে উপরোল্লিখিত সব নথি উদঘাটনের তথা মুক্তিযুদ্ধের পার্বত্য চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চরম সত্য আবিস্কারের লক্ষ্যে নির্মোহ, নাছোড়বান্দা সঙ্কল্প, অনুসন্ধিৎসা ও দৃঢ়তা এদেশের আমরা ক’জনই বা রাখি!

(৩)

বন্ধুগণ, স্থানীয় জনগণের অধিকারভোগের দিক থেকে ভূস্বর্গ কাশ্মীর এবং পার্বত্য জুমপাহাড়ের মধ্যে তেমন কোনো বৈসাদৃশ্য না থাকলেও ফজলুল কাদের চৌধুরীর মতো ধুরন্ধর কিছু বাঙালি মুসলিম লীগারের প্ররোচনায় সেই পার্থক্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গড়ে দিয়েছে আজ থেকে প্রায় ৫৭ বৎসর আগে। অর্থাৎ ১৯৬২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মর্যাদা হরণের মাধ্যমে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সেই ঘটনার ৫৭ বৎসর এবং ১৯৫৪ সালে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু কর্তৃক কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের ৬৫ বৎসর পরে ভারত সরকার গত ৬ আগস্ট ২০১৯ কাশ্মীরের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম মডেলের সেই কাজটিই সংঘটিত করলো। তার মানে সাধারণ যুক্তি অনুযায়ী, পার্বত্যবাসীরা রাষ্ট্রের ক্রমাগত নিপীড়নে-নিষ্পেষণে আজ যেমন কোণঠাসা, আগামী ৫৭ বা ততোধিক বৎসর পরে কাশ্মীরিরাও সেই অবস্থায় গিয়ে পৌঁছবেন। এটি সাধারণ পাটিগণিতগম্য একটি হিসাব। তবে কাশ্মীরি ভ্রাতা-ভগ্নীদের জন্য এমন সম্ভাব্য দুরাবস্থার আগাম শঙ্কায় এখন যাদের নিদ হারাম, আমি তাঁদের সাথে একমত নই। কারণ, আমার বিবেচনায় ভারত এখনো বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র এবং বহুজাতির, বহুধর্মের, বহুভাষার, বহুসংস্কৃতির সমাহারে বর্ণিল এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যার রয়েছে কমপক্ষে ১০০টি পূর্ণাঙ্গ ভাষা এবং ১,৬০০টি উপভাষাসহ হাজারো বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত আঞ্চলিক ও জাতিগত ভিন্নতর সংস্কৃতি। বিভিন্ন জাতির এইসব বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্য একসাথে মিলিয়েই তাঁরা একটি মহাজাতি। সেকারণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের দেওয়া নামেই কোলকাতায় রয়েছে ‘মহাজাতি সদন’। একইভাবে ভারতের জুডিসিয়ারি, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো আমাদের চেনাজানা অন্যান্য প্রতিবেশি অনেক দেশের প্রতিষ্ঠানের মতো ভেঙ্গে পড়েনি। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের বিরুদ্ধেও কিন্তু সুপ্রীমকোর্টে মামলা দাখিল হয়ে গেছে। তাই ধারণা করি, আগামীতে কাশ্মীরিদের জন্য নয়াদিল্লীর ভূমিকা পার্বত্য আদিবাসীদের প্রতি ঢাকার চলতি ভূমিকার মতো হবে না। কাশ্মীরে নির্বিচারে অমুসলিম জনসংখ্যা ঢুকিয়ে দিয়ে ‘শান্তি-সম্প্রীতি-উন্নয়ন’ প্রতিষ্ঠার মডেলটিও নিশ্চয় আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের সামরিকায়িত শান্তি-সম্প্রীতি-উন্নয়ন বাণিজ্যের মতো হবে না। তাঁদের কোনো কোনো রাজনীতিক হয়তো বাক-স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে আজেবাজে অনেক কিছুই বকবেন। কিন্তু শেষ কথা বলবেন তো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজিই। এদেশে যেমন জননেত্রী শেখ হাসিনা। সুতরাং, রাজনীতি নিরপেক্ষ সাধারণ হিতাকাঙ্ক্ষীদের তরফে কাশ্মীর বিষয়ে অতিমাত্রায় শঙ্কিত হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই বলে মনে করি। হয়তো দেখবেন, নতুন পরিস্থিতিতে কাশ্মীরে অনুসৃত ভারতের সেই ‘শান্তি-সম্প্রীতি’র মডেলটিই প্রতিবেশি অন্য দেশগুলোর জন্যেও আবশ্যকীয়-অনুসরণীয়-অনুকরণীয় ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

(৪)

এ তো গেলো কাশ্মীর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম – এই দুই ভূখণ্ডের শাসনতান্ত্রিক মিলের কথা। অমিলেরও অনেক বিষয় কিন্তু রয়ে গেছে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে নিচে তুলে ধরছি। যেমন আমি দেখেছি যে, জম্মু-কাশ্মীর বিষয়ে আলোচনার সময় আলোচকগণ শুধুমাত্র ১৯৪৭ সাল পরবর্তী ৭০-৭২ বছরের ইতিহাসের মধ্যেই ঘুরপাক খান। তার আগের সময়ের কাশ্মীর কেমন ছিলো এবং কারা এর বাসিন্দা ছিলেন সে বিষয়ে জানতে এবং জানাতে তাঁরা কেমন যেন কুণ্ঠিত। যদি বলি, কাশ্মীরে মুসলমানরা নন, হিন্দু-বৌদ্ধরাই ছিলেন ঐ ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা, তাহলে কি খুব ভড়কে যাবেন? হ্যাঁ বন্ধুগণ, অপ্রিয় সত্যটি আসলে সেরকমই, যা হজম করাটা হয়তো একটু কষ্টকরই হবে। যেমন, ১১৫০ সালের দিকে কাশ্মীরি ঐতিহাসিক কলহন আমাদের পার্বত্য চট্টলার ‘চাকমা রাজলহরী’র অনুরূপ ‘রাজতরঙ্গিণী’ নামে কাশ্মীরের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রচনা করেন। তাতে ঐ অঞ্চলের খ্রিস্টপূর্ব ৩,৪৫০ সাল থেকে শুরু করে তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ লিপিবদ্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি সব মিলিয়ে ১৪১ জন রাজা/রানী/শাসকের নাম উল্লেখ করেছেন। এই রাজা-রানীগণ প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক বৎসর ধরে কাশ্মীরকে শাসন করেছেন, নানান ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের মিশেলে কাশ্মীরের জনজীবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বজন স্বীকৃত প্রথম রাজা ছিলেন গোনান্দা, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩৮-৩১৮৮ সালে কাশ্মীর শাসন করেছিলেন। তিনি আবার ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবতারতুল্য মৌর্যশাসক সম্রাট অশোকের পূর্বপুরুষ। ঐতিহাসিক কলহনের মতে, সম্রাট অশোকের শাসনকালে (খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩-২৩২) কাশ্মীর সমৃদ্ধির উত্তুঙ্গ শিখরে পৌঁছেছিলো। কথিত আছে যে, সম্রাট অশোকই বর্তমান কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের গোড়াপত্তন করেছিলেন। তাঁর আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণায় কাশ্মীর অঞ্চলে বৌদ্ধ ও শৈবধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। যদিও আরও বহুকাল আগে থেকেই সেখানে বৌদ্ধ ধর্মের অসামান্য প্রভাব ছিলো। পরবর্তীতে কাশ্মীর উপত্যাকা থেকে বৌদ্ধধর্ম লাদাখ অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এর বিবরণ চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েনসহ ৬৩০-৭৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতবর্ষে আগত অনেক পর্যটকের ভ্রমণ-লেখায় বিধৃত আছে। ঐতিহাসিকদের মতে রাজা সুরেন্দ্রই ছিলেন কাশ্মীরের প্রথম বৌদ্ধ শাসক, যার শাসনামলে কাশ্মীর উপত্যাকায় সমৃদ্ধি-শান্তি-সুখের অন্ত ছিলো না। আর ঐতিহাসিক কলহন কথিত কাশ্মীরের ১৪১ জন শাসকের সকলেই ছিলেন হিন্দু ও বৌদ্ধ নৃপতি। তখনো পর্যন্ত কাশ্মীরে কোনো মুসলমান শাসকের অস্তিত্ব ছিলো না।

এভাবে খ্রিস্টপূর্ব হাজার বছরের ঐতিহাসিক কালপর্বের ধারাবাহিকতায় খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতক পর্যন্ত কাশ্মীর উপত্যকায় বৌদ্ধ ও শৈব মতবাদের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এরপর ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটে। তাও আবার প্রথমে রাজপরিবারের সরল-সাদাসিধে-বিভ্রান্ত জনাদুয়েক সদস্য এবং স্থানীয় কিছু মানুষকে ধর্মান্তরকরণের মাধ্যমে। এখন যেমনটি আমাদের বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার কিছু এলাকায় ঘটছে (অবশ্য জানামতে রাজপরিবার বাদে)। ফলে পূর্ববর্তী বৌদ্ধ-শৈব সভ্যতার সাথে নবাগত ইসলামী রাজনীতি ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে সূচনা ঘটে কাশ্মীরি সুফিবাদের। কাশ্মীরে আগত প্রথম মুসলমান (দরবেশ) বুলবুল শাহের বক্তৃতায় সম্মোহিত হয়ে কাশ্মীরের বৌদ্ধ শাসক রিনচান ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক সুলতান সদরুদ্দিন শাহ নাম ধারণ করেন। সেই হিসেবে তিনিই ছিলেন কাশ্মীরের প্রথম ধর্মান্তরিত মুসলমান শাসক, যার পূর্বপুরুষ সকলেই ছিলেন গৌতম বুদ্ধের একান্ত অনুসারী। পরবর্তীতে তাঁর শ্যালকও (যিনি নিজে সেনাপ্রধান) ইসলামে দীক্ষিত হয়ে সুলতান শাহ মীর উপাধি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ১৩৩৯ সালে কাশ্মীরের শাসনভার হস্তগত করে শাহ মীর রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী পাঁচ শতাব্দীব্যাপী কাশ্মীরে মুসলিম শাসন বলবৎ ছিলো, যেখানে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত হিন্দু-বৌদ্ধ প্রজাসাধারণ ক্ষমতার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। যেমন, কাশ্মীর উপত্যাকায় কাশ্মীরি পণ্ডিত নামে খ্যাত যেসব হিন্দু আদি বাসিন্দা ছিলেন, তাঁদের অনেককেই জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়। সুলতান সিকান্দার বুতশিকানের শাসনামল (১৩৮৯-১৪১৩ খ্রিস্টাব্দ) এই কাশ্মীরি হিন্দু, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরকে সর্বাধিক পরিমাণে এবং জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরকরণের জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। ‘বুতশিকান’ হলো তার যাবতীয় নৃশংস ও সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রাপ্ত উপাধি, যার অর্থ মূর্তি ধ্বংসকারী। এভাবে হিন্দু-বৌদ্ধদের মূর্তি-মন্দির ধ্বংস, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণসহ নানান ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৩৩৯ থেকে ১৮১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৮০ বৎসর ধরে কাশ্মীরে ইসলামী সুলতানদের শাসন বলবৎ ছিলো। আর সেকারণে এখন কাশ্মীরের মুসলমানরা এবং তাদেরসহ অন্যান্য ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীর মদদদাতা পাকিস্তান রাষ্ট্রটি দাবি করে যে, কাশ্মীর উপত্যাকা একান্তই তাদের। কাশ্মীরে ইসলাম আগমনের আগের আর পরের ইতিহাস এই কট্টর আমিত্ববাদী ইসলামপন্থীদের কাছে বিবেচ্য কোনো বিষয়ই নয়। আর বিশ্বের উন্নত, পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও নিজেদের আধিপত্য ও বাণিজ্যের স্বার্থে সবকিছু জেনেও এই ইস্যুতে কখনো ভারতের পক্ষে, কখনো পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কূটনীতি-ঋদ্ধ অমৃতবাণী বর্ষণ করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত রয়েছে। কারণ, ভারত রাষ্ট্রটি আসলেই হিমালয় শৃঙ্গ থেকে মহাসাগর অবধি বিস্তৃত এক বিশাল দেশ-মাতৃকা। তাঁর কাছ থেকে পাওয়ার বা নেওয়ার যে অনেক কিছুই আছে!

(৫)

এরপরের ইতিহাসটি কাশ্মীরে ইসলামী সালতানাতের ক্ষমতাচ্যুতির ইতিহাস। মুসলমানদের সাথে তুমুল যুদ্ধের পর সেনাপতি রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে ১৮১৯ সালে শিখরা কাশ্মীর দখলে নেন। এরপর ১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে শিখরা ইংরেজদের নিকট পরাজিত হলেও জম্মুর রাজা গুলাব সিং কূটবুদ্ধি খাটিয়ে অমৃতসর চুক্তি অনুযায়ী পুনরায় ব্রিটিশদের কাছ থেকে অঞ্চলটি ক্রয় করে কাশ্মীরের নতুন শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরগণ ব্রিটিশ রাজমুকুটের অনুগত শাসক হিসেবে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাশ্মীর শাসন করেন।

তবে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় কাশ্মীর একটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়। কারণ, কাশ্মীরের মুসলমানরা ইতোমধ্যে অঞ্চলটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। তখন তাঁদের অধিকাংশ পাকিস্তানের পক্ষে এবং বাকি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলমানরা ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে তৎপর ছিলেন। প্রজাদের এই অবস্থা দেখে তৎকালীন মহারাজা হরি সিং আগের মতো কাশ্মীরের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য সচেষ্ট হন। কারণ অবিভক্ত ভারতবর্ষের স্থানীয় রাজা/রানী শাসিত ৬৫০টির অধিক দেশীয় রাজ্যের অনেকেই তখনো ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রের সাথে নিজেদের নাম যুক্ত করেনি। কিন্তু কাশ্মীরকে স্বাধীন রাখার পক্ষে মহারাজা হরি সিংয়ের সেই স্বপ্ন অচিরেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ এক কারসাজিতে। পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে স্থানীয় একটি প্রজাবিদ্রোহকে উস্কে দিয়ে এবং নিজেও সিভিল-মিলিটারি সমন্বিত এক বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে অকস্মাৎ কাশ্মীরের পশ্চিমাংশ দখল করে নেয়। উপায়ান্তর না দেখে রাজা হরি সিং ভারতের রাজধানী দিল্লীতে পালিয়ে যান এবং ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেন। অবশেষে তিনি দেশ বিভাগের প্রায় আড়াই মাস পর ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেয়। অবশিষ্ট অংশটি ‘পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর’ নামে স্বীকৃত হয়, যাকে আবার পাকিস্তানীরা ‘আজাদ কাশ্মীর’ নামে ডাকে। বলাবাহুল্য, কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের এসব ঘটনা ১৯৪৭-১৯৪৮ সালের। আলোচ্য সকল যুদ্ধ-ঘটনার প্রেক্ষিতে এবং পাকিস্তানের অন্যায্য, ধর্মান্ধ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ভারত ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়। ভারতের অভিযোগ আমলে নিয়ে জাতিসংঘও সেই বৎসরের ১৩ আগস্ট তারিখে পাকিস্তানকে কাশ্মীর উপত্যাকা থেকে তার সব সৈন্যসামন্ত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু পাকিস্তান জাতিসংঘের নির্দেশ অমান্য করে যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে অবশেষে ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি এই বিশ্ব সংস্থারই দূতিয়ালিতে ভারত ও পাকিস্তান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এতে সমঝোতা হয় যে, কাশ্মীরের ৬৫% অঞ্চল ভারতের নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি ৩৫% পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যুযুধান দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত কাশ্মীরের এই সীমানা এখনো আন্তর্জাতিকভাবে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ বা ‘এলওসি’ নামে প্রসিদ্ধ। একমাত্র এই সমঝোতার পরই এতোদিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়ে আসা কাশ্মীর ১৯৫৭ সালে তার বিশেষ স্বশাসন ব্যবস্থাসহ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত হয়।

এরপর আসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন মুক্তি বাহিনী ও পূর্ব পাকিস্তানকে ভারত সাহায্য করছে এই অজুহাতে পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম সীমান্তের বিমান ঘাঁটিগুলোতে উপর্যুপরি আক্রমণ হানতে থাকে। এতে অগ্নিশর্মা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভারতও ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, যার সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মাধ্যমে। এরপর ১৯৮০-১৯৮৯ সালের দিকে আইএসআই-এর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে কাশ্মীরের জনসমর্থন নাটকীয়ভাবে ভারতের বিপ্রতীপে এবং পাকিস্তানের স্বপক্ষে ঘুরে যায়। পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে এবং প্রকাশ্যে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী, ভারত বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী, ইসলামী জিহাদি তথা শরিয়া আইনের অনুগামী কাশ্মীরি উগ্রপন্থীদেরকে সার্বিক সহায়তা ও মদদ দিতে থাকে। ফলে ভারতও তখন থেকে কাশ্মীর ইস্যুসহ দুই দেশের সম্পর্ক-সংঘাতের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কিংবা তৃতীয় পক্ষের যে কোনো মধ্যস্থতা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।

(৬)

বন্ধুগণ, আপনারা জানেন যে, ‘কাশ্মীর উপত্যাকা’ এখন ভারত, পাকিস্তান, চীন – এই তিন রাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজিত। ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কাশ্মীরের ৬৫% অঞ্চল। বাকি অংশ পাকিস্তান ও চীনের নিয়ন্ত্রণে। ভারতীয় অংশে রয়েছে তৎনিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ। পাকিস্তানের হাতে আছে আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিত-বালতিস্তান অঞ্চলদ্বয়। আর চীনে রয়েছে আকসাই চিন ও ট্রান্স-কারাকোরাম পার্বত্য অঞ্চল।

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখের মোট আয়তন ৮৫,৮০৬ বর্গমাইল। মোট জনসংখ্যা ১,৪৪,২১,৮১৯ (২০১৮ সালের হিসাব)। সাক্ষরতার হার ৬৮.৭৪%। সারা রাজ্যে মোট মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৬৮.৩১%। আর হিন্দু-শিখ-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান মিলে বাকি সবাই ৩১.৬৯%। তবে এককভাবে কাশ্মীরের মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৬.৪০%, জম্মুতে ৩৩.৪৫%, লাদাখে ৪৬.৪০% (আদমশুমারি ২০১১)। সব মিলিয়ে রাজ্যে জেলার সংখ্যা ২২টি। তন্মধ্যে ১৭টি জেলা মুসলমান-গরিষ্ঠ। বাকি ৪টি জেলায় হিন্দুরা এবং ১টি জেলায় বৌদ্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

অন্যদিকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর বা ‘আজাদ কাশ্মীরের’ মোট আয়তন হলো ৫,১৩৪ বর্গমাইল (প্রায় আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের সমান)। জনসংখ্যা ৪০,৪৫,৩৬৬ (আদমশুমারি ২০১৭ অনুসারে)। জেলার সংখ্যা ১০টি। ভারতের সাথে যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের ২৪ অক্টোবর রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়। দাবি করা হয় যে, রাজ্যটিতে ওয়েস্টমিন্সটার মডেলের পার্লামেন্টারি পদ্ধতি নাকি বহাল আছে। তার নিজস্ব হাইকোর্ট এবং সুপ্রীমকোর্টও নাকি রয়েছে। পাকিস্তান সরকারের কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘আজাদ কাশ্মীর’ সরকারের সাথে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। তবে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে এই আজাদ কাশ্মীরের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। ইত্যাকার ধামাচাপা দেখে বুঝতে কষ্ট হয়না যে, তথাকথিত ‘আজাদ কাশ্মীর’ তথা বরফাচ্ছাদিত এই মুক্ত উপত্যাকাটি আসলে ভারত বিরোধী ইসলামী জঙ্গিদের আস্তানা ও ট্রেইনিং গ্রাউণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। ধারণা করি, এই তথাকথিত সরকার বা অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণত পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হাতেই। আইরনিক্যালি, গোটা দেশটিই তো আসলে তাদের অঙ্গুলিহেলনেই চলছে!

আর চীনের নিয়ন্ত্রণে কাশ্মীরের যে অংশটি রয়েছে তার নাম ‘আকসাই চীন’। ভারতের মতে এটি লাদাখেরই অংশ, যা ১৯৬২ সালে সংঘটিত যুদ্ধের সময় চীন অন্যায়ভাবে নিজের দখলে নেয়। অন্যদিকে চীনের মতে, ‘আকসাই চীন’ তাদের জিংজিয়াং প্রদেশেরই অংশ। উভয় দেশের এতোসব বাহাসের একটি কারণ সম্ভবত অঞ্চলটির বিশালতা। এর আয়তন ৩৭,০০০ বর্গ কিলোমিটার। আর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অঞ্চলটির উচ্চতা প্রায় ১৬,০০০ ফুট। অথচ এহেন উচ্চতায়ও সেখানে টিকে আছে প্রাচীন অসংখ্য ধ্বংসাবশেষ। সেসব দেখে বোঝা যায়, অঞ্চলটি একটি প্রাচীন বাণিজ্যপথ ছিলো, যা সামরিক অভিযানের জন্যও ব্যবহৃত হতো। তবে যাযাবর কিছু মানুষ ছাড়া দুর্গম এই অঞ্চলটিতে তেমন কোনো জনবসতি নেই বললেই চলে।

চীনের হেফাজতে কাশ্মীরের কারগিল সন্নিহিত আরেকটি অঞ্চল আছে, যার নাম ট্রান্স-কারাকোরাম ট্র্যাক্ট। প্রচলিত জনভাষ্যমতে, ১৯৪৭ সালের যুদ্ধে ভারত থেকে অধিকৃত কাশ্মীরের এই বিশেষ অঞ্চলটি পাকিস্তান ‘অমিমাংসিত এলাকা’ জেনেও অর্থের বিনিময়ে স্বেচ্ছায় চীনের হাতে তুলে দিয়েছে। এর জন্য তারা ১৯৬৩ সালের ২ মার্চ একটি লোকদেখানো চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। সেটি ‘চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি’ নামে পরিচিত। তবে ভারত কখনো চীন-পাকিস্তানের সেই অনৈতিক চুক্তিকে মেনে নেয়নি কিংবা বিশ্বাস করতে পারেনি। কারণ, ঐ চুক্তিতে লাদাখের কিয়দংশসহ প্রতিবেশি ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি চীনের হুমকিবাচক কিছু অন্যায্য শর্ত পাকিস্তান মেনে নিয়েছে। ভারত মনে করে, ট্রান্স-কারাকোরাম পার্বত্য অঞ্চলটি (প্রায় ২,০০০ বর্গমাইল) তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহজিও সম্প্রতি পার্লামেন্টে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সে দাবির পুনরুল্লেখ করেছেন। আর সেই নীতিগত কারণেই ভারত এখনো স্বদেশের পুঁজিপতি/ব্যবসায়ীদের ব্যাপক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পে যোগদান করতে সম্মত হয়নি। কারণ, চীনের এই হাজার বিলিয়ন ডলার প্রকল্পের একটি রাস্তা বা হাইওয়ে ভারতের দাবীকৃত ট্রান্স-কারাকোরাম পার্বত্যাঞ্চলের ভেতর দিয়েই আফগানিস্তান-ইরান-তুরস্ক হয়ে ইউরোপে চলে যাচ্ছে।

(৭)

বন্ধুগণ, এতোক্ষণ কাশ্মীর প্রসঙ্গে চার-পাঁচ-সাতটি দেশের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার বাস্তবে প্রত্যক্ষ করা কিছু ঘটনা বা অভিজ্ঞতার কথা বলি। তার আগে সংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকে অধিকার বিষয়ক একটি অনুসিদ্ধান্ত জানার প্রবল ইচ্ছে জাগছে। সেটি হলো, ত্রয়োদশ-পঞ্চদশ শতাব্দীর আগে-পরের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান পূর্বসূরি এবং তাঁদের বর্তমান প্রজন্মের বংশধরেরা যদি কাশ্মীরের উপর নিজেদের পূর্ববৎ শাসনাধিকার দাবি করে বসেন, তাহলে আপনারা কি তাঁদেরকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে বা তাঁদের অধিকারের ন্যায্যতা স্বীকার করতে রাজি আছেন? তাঁরা যদি বলেন যে তলোয়ারের নিচে ফেলে, ভয় দেখিয়ে তাঁদের পূর্ব-প্রজন্মের প্রিয়জনদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিলো, যা একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন; তা কি আপনারা মানবেন? ইতিহাসের নানা পর্বে সংঘটিত ঐসব নিষ্ঠুরতা এবং অন্যায্যতাকে শুধরানোর পক্ষে কি আপনারা থাকবেন, যেমনটি এখন ভারতের মোদী–শাহ’র সরকার শুরু করে দিয়েছে?

এই প্রসঙ্গে আমার এক কাশ্মীরি বন্ধুর কাহিনী বলি। দিল্লীর জাকির হোসেন কলেজে আমার ছাত্রজীবনকালে একই হোস্টেলের বেশ সিনিয়র এবং সদা হাস্যজ্জ্বল ও পরোপকারী এক কাশ্মীরি ছাত্রের সাথে আমার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তিনি ছিলেন কাশ্মীরের আদি বাসিন্দা পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মানুষ। ডাইনিং রুমে খাবার টেবিলে বসলে নানান বিষয়ে অনেক গল্প হতো। একদিন আমার অনুরোধে কাশ্মীরের গল্প শোনাতে গিয়ে এই সরলপ্রাণ এথলেট বন্ধুটি সবার সামনে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। তাঁকে নিয়ে আমরা তখন সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কারণ, এমন পরিস্থিতির জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। ফলে আর কোনো গল্প বা খাওয়া-দাওয়া সেদিন হলোনা। হোস্টেলের রুমে তাঁকে পৌঁছানোর পর আমি একটু রয়েসয়ে তাঁর এহেন আবেগকাতরতার পেছনের গল্প জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, কয়েক বছর আগে কাশ্মীরের কিছু ইসলামী কট্টরপন্থী তাঁর বাবাকে সবার সামনে মারতে মারতে অপহরণ করে নিয়ে যায়। অনুরূপভাবে তাঁর এক কাকীমাকেও। তাঁদেরকে নাকি আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁরা শুনেছেন যে, কাকীমাকে গুলি করে মারার আগে গণধর্ষণ করা হয়েছিলো। এতো আসলে আমাদের পার্বত্য জুমপাহাড়েরই অনুরূপ অশ্রুভেজা উপাখ্যান। সেদিন কাশ্মীরি বন্ধুটির বেদনার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আমিও যে গভীর বেদনা অনুভব করেছি, তাতে আর কোনোদিন কাশ্মীর বিষয়ে তাঁকে কোনো প্রশ্ন করার সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি। ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় যে, এই ইসলামী জিহাদিরা কাশ্মীর উপত্যাকা থেকে পণ্ডিত সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ৫-৬ লক্ষ মানুষকে নানাবিধ অত্যাচার-নিপীড়নের মাধ্যমে উদ্বাস্তু, ছিন্নমূল করেছে। অথচ ১৯৯০ সালের আগেও তাঁরা সেখানে নিজেদের বাস্তুভিটায় সগৌরবে, সসম্মানে বসবাস করতেন। তাঁদের অনেক নারীকে ইসলামী জিহাদিরা নির্বিচারে অপহরণ ও ধর্ষণ করেছে। ফলে ২০১১ সাল নাগাদ দেখা গেছে, পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মাত্র ২,৭০০-৩,৪০০ মানুষ কাশ্মীর উপত্যাকায় কোনোক্রমে অবশিষ্ট রয়েছেন। বাকিরা আমার বন্ধুটির মতো অনেক বেদনা সয়ে পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলোতে আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তথা ‘দেশহীন মানুষ’ হিসেবে কোনোক্রমে টিকে আছেন।

(৮)

দ্বিতীয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটি ভারতের তরুণ মুসলিম মানস ও কাশ্মীর বিষয়ক। দিল্লীতে অরুণাচলের চাকমা ও হাজংদের নাগরিকত্বের দাবিতে সেমিনারের আয়োজন করতে গিয়ে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক তরুণ মুসলমান ছাত্রের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে তাঁদের ধর্মভ্রাতাদের দ্বারা পাহাড়িদের ওপর কীসব উৎপীড়ন-নিপীড়ন ঘটছে সেসব না জেনেই তাঁরা ভারতের সহ-নিপীড়িত সম্প্রদায় হিসেবে অরুণাচলের চাকমা-হাজংদের নাগরিকত্বের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন এবং সেমিনারটি সফল করার জন্যে জানপ্রাণ দিয়ে খেটেছিলেন। সেজন্যে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ তাঁদের সবার কাছে। উল্লেখ্য, এদের একজন আবার ছিলেন বিশ্বের সৌন্দর্য–রানী সুস্মিতা সেনের বাল্যবন্ধু। সে অনেক কথা ও গল্পসম্ভার। একদিন বন্ধুটি সুস্মিতা সেন যে পাথরে মাথা কুটে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন, সেই বিশাল কালা-পাথরের উপর আমাদেরকে বসিয়ে গভীর রাত্রে জেএনইউ’র রাত্রিকালীন কড়া কফি খাওয়ালেন। যাকগে সেসব কথা। তবে ভারতের মুসলমানরা চাকমাদের/জুম্মদের প্রতি যে সর্বতোভাবে সহানুভূতিশীল ও সমব্যথী, সেকথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কোলকাতায়ও পরিচিত মুসলমানদের মধ্যে আমি পাহাড়ি/জুম্মদের প্রতি সেই সমবেদনা, সম-উৎকণ্ঠা প্রত্যক্ষ করেছি। প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক আবুল বাশার এবং বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য অধ্যাপক হোসেনুর রহমান স্যারের সাথে কথা বলে আমার সেই ধারণা ও বিশ্বাস আরও দৃঢ়মূল হয়েছে। অবশ্য দিল্লীর সেই সেমিনারের নেপথ্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের হিন্দু ছাত্র যারা ছিলেন, তাঁদের কথা এখানে আর বলছি না।

তবে উপরোক্ত ব্যক্তিগত লাভালাভের হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে আমি যখন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের মুসলিম ছাত্রদের নিজস্ব দুঃখ-বেদনা-ক্ষোভের কথা জানতে গেলাম তখন রীতিমতো শকড হতে হলো। দেখলাম, তাঁদের অনেকের অন্তরে না পাওয়ার অনন্ত বেদনা যেনো টগবগ করে ফুটছে। এদের একজন আমাকে বললেন, দেখো সমগ্র ভারতবর্ষ একদিন মুসলমানরাই এই দিল্লীর মসনদে বসে শাসন করতো। অথচ আমরা এখন কী দেখছি, কী পাচ্ছি? কল্পনা করে দেখো তো, এই মালাউনরা কখনো কি একজন মুসলমানকে এদেশের সেনাপ্রধান বা গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেবে? দেবেনা, কারণ তারা মুসলমানদেরকে সন্দেহের চোখে দেখে। তাহলে সম-অধিকার আর কোথায় থাকলো? এই দুঃখ যে কোথায় রাখি! এসব কথা বলতে বলতে সেই তুখোড়, পরোপকারী মুসলিম ছাত্রটিরও আমার কাশ্মীরি বন্ধুটির মতো প্রায় কাঁদো কাঁদো করুণ অবস্থা। তবে তাঁদের সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতির নির্মোহ বিচার-নিরীক্ষণ-বিশ্লেষণ-ধারণায়নের চেয়ে কাজেকর্মে তাঁদের আবেগীয় উদ্দীপনা-উন্মাদনার প্রভাব ও পরিমাণটা কেনো যেনো একটু বেশি। কারণ, আমরা তো জানি যে, সেনাপ্রধান, গোয়েন্দা-প্রধান হতে না পারলেও ভারতের বিশাল জনসংখ্যার মাত্র ১৫% এর মতো একটি জনগোষ্ঠী থেকে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্টের স্পিকার, আদালত-প্রধান, মন্ত্রী, পুলিশ-প্রধান, বায়ুসেনা-প্রধান, পরমাণু কেন্দ্র-প্রধান, ক্রিকেট-প্রধান, বলিউড-প্রধান, এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাং-প্রধান ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পদে ভূষিত হয়েছেন। পৃথিবীর কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে এমন পরিমাণে এবং বিশ্বাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবী প্রদানের নজির নেই। কিন্তু ভারতের মুসলমানরা তবুও কেনো এতো অসন্তুষ্ট, তা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হওয়া উচিত।

ছাত্রজীবনে দিল্লীতে অবস্থানকালে তরুণ মুসলিম ছাত্রদের আরেকটি আবেগীয় বিস্ফোরণ আমি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছি। দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত একটি রেওয়াজ হলো, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেখানে দেশের গুণীজনদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট বিবিধ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য শ্রবণ। কাশ্মীর বিষয়ক তেমন একটি অনুষ্ঠানে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম, যেখানে মূল বক্তা ছিলেন উপমহাদেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক (কিছুদিন আগে প্রয়াত) শ্রী কুলদীপ নায়ার। তিনি কাশ্মীরের সমস্যাকে বিভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে বিশ্লেষণ করে ইংরেজিতে চমৎকার এক বক্তৃতা উপহার দিলেন। উপস্থিত অধিকাংশ শ্রোতা বক্তৃতার মাঝে এবং বক্তৃতার শেষে হাততালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। কিন্তু এমন সুন্দর একটি অনুষ্ঠানে বাধ সাধলেন কিছু তরুণ মুসলমান ছাত্র। তাঁদের অনেকে কুলদীপ নায়ারজির উদ্দেশ্যে একের পর এক প্রশ্নবাণ ছুঁড়তে থাকলেন। একজন জানতে চাইলেন ‘আপনি কাশ্মীরের স্বাধীনতা এবং পাকিস্তানের সাথে কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তিকে সমর্থন করেন কিনা? হ্যাঁ বা না শব্দে উত্তর দিন’। আরেকজন বললেন, ‘আপনার ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা সব কথা আসলে কাশ্মীরি জনগণের বিরুদ্ধেই। কারণ, আপনি কাশ্মীর থেকে সেনাশাসনের অবসান চান না।’ অপরজন কোনরূপ সৌজন্য ব্যতিরেকে গোঁয়ার জঙ্গির মতো সরাসরি বলে বসলেন, ‘আপনি ভারত সরকারের নিয়মিত মাসোহারাপ্রাপ্ত একজন দালাল। তাই ভারতের কাশ্মীর নীতির পক্ষে কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ করতে এখানে এসেছেন। আপনাকে কাশ্মীর ইস্যুতে এখানে আমন্ত্রণ জানানো আয়োজকদের মোটেও উচিত হয়নি’। বলাবাহুল্য, ভারতের সংবিধানে উল্লেখিত বাক-স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মুসলমান ছাত্রদের তরফ থেকে আসা এহেন নির্মম প্রশ্নবাণ তথা অভব্য আক্রমণে অতিশয় শান্ত, সুভদ্র, অমায়িক কুলদীপ নায়ারজি কিছুটা ব্যথিত, বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। এরপরও নিজেকে সামলে নিয়ে মুসলমান ছাত্রদের এহেন প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘প্রিয় ছাত্র বন্ধুগণ, আমার জ্ঞান সত্যিই খুব সীমিত। সাংবাদিকতা করে, কিছু কলাম লিখে কতোটুকুই বা জ্ঞানার্জন সম্ভব! তোমরা আমার চেয়ে অনেক বেশি জানো, তা আমি অকপটে স্বীকার করছি। তোমরা আমার আরেকটি জ্ঞানচক্ষু খুলে দিলে, যে বিষয়ে আগে আমার কোনো ধারণাই ছিলো না। তবে এর আগে আমি পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রেসক্লাবে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একইভাবে বক্তৃতা করেছি। পাকিস্তানের কোনো নাগরিকের কাছ থেকে আমাকে এতো কটু কথা শুনতে হয়নি, যা আমার নিজের দেশে আজ শুনতে হলো। আমার এখন নিজ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েই খুব চিন্তা হচ্ছে। আমরা কি আসলে শিক্ষায়-সভ্যতায় পাকিস্তানের চেয়েও ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি? বন্ধুরা, বিষয়টি একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন। সবাই ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।’ তাঁর এই প্রত্যুত্তর শুনে অনুষ্ঠানের একজন পার্টিসিপেন্ট হিসেবে লজ্জ্বায় আমার নিজেরই মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিলো। এদেশে হলে নিশ্চয়ই আয়োজকদের তরফ থেকে শালার সংখ্যালঘু-উপজাতিকে ‘ধরো-মারো-কাটো’ জাতীয় কাণ্ড শুরু হয়ে যেতো, যা আমরা মাঝেমধ্যে নানান ঘটনায় প্রত্যক্ষ করে থাকি। কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটলো না। সবাই যথাযথ ভদ্রতা, ভব্যতা বজায় রেখে চা-নাস্তা খেয়ে যে যার মতো করে অনুস্থানস্থল ত্যাগ করলেন। হোস্টেলে ফেরার পর পরিচিত সেই মুসলিম বন্ধুকে বললাম, কুলদীপ নায়ারজিকে ওভাবে বলাটা তোমার উচিত হয়নি। সে বললো, ‘এক্সট্রিমলি সরি বন্ধু, রেগে গিয়েছিলাম। আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। তবে এখন বেশ অনুশোচনা ও কষ্ট হচ্ছে।’ আমি এখনো সত্যিই জানিনা, নানাদেশে বিরাজিত আমার মুসলমান বন্ধুদের দেহ-মন-প্রাণ-হৃদয়-অন্তরে সঞ্চরিত আবেগের পরিমাণ বা মাত্রাটা একটু বেশি কিনা। যা অনেকটা জান-প্রাণ দিয়ে পাগলপারা ভালোবাসার পর ছ্যাকা খেলে মুহূর্তেই প্রিয়তমার তলপেটে কিরিচ ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার। আবেগান্ধ এমন হতকারিতাকে আসলেই কি প্রেম বলা যায়? নাকি এটি স্রেফ ‘কিলার ইন্সটিঙ্কট’? পাকিস্তানের মদদে কাশ্মীরে বছরের পর বছর ধরে যা ঘটছে সেটিও কি সেরকম কিছু? বন্ধুগণ, আমি সত্যিই জানিনা।

(৯)

দিনকয়েক আগে টিভি চ্যানেল এটিএন নিউজে সাংবাদিক প্রণব সাহা এবং মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় কাশ্মীর বিষয়ক দু’টি অনুষ্ঠানে এদেশের সাবেক দুই পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্য শুনছিলাম। প্রথমজন ছিলেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্র সচিব। তাঁর মতে, কাশ্মীরের জন্য আলাদা যে পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ও বিধিব্যবস্থা সেটি এক দেশে দুই ব্যবস্থা চালু থাকার সমান। তাই সেক্ষেত্রে সমতা বিধান অন্যায় বা অন্যায্য কিছু নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও এদেশের বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জামায়াত নির্বিশেষে অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী অনুরূপ বক্তব্য দিয়ে থাকেন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামে কাশ্মীরের অনুরূপ আলাদা পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত কিছুই নেই এবং আন্দোলনকারী দলগুলোর তরফেও কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতো অন্য দেশের সাথে অঙ্গীভূত হওয়ার কিংবা স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো অভিলাষ, কর্মসূচি বা তৎপরতা নেই।

আরেকজন পররাষ্ট্র সচিব বলছেন, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তথা ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করাটা সঠিক কাজ হয়নি। এতে কাশ্মীরে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে। তাঁর মতে, অধিকতর স্বায়ত্ত্বশাসন প্রদান করলেই নাকি জাতীয় সংহতি (ন্যাশনাল ইনটিগ্রেশন) সুদৃঢ় হয়। প্রায় একই বক্তব্য আমি বহুদিন আগে পার্বত্য পরিস্থিতি নিয়ে একশন এইড আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে  বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ডঃ এমাজউদ্দিন আহমদের মুখে শুনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীতে এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমন কোনো নজির নেই যে, অধিকতর স্বায়ত্ত্বশাসন বা অধিকার অর্জনের পর কোনো জনগোষ্ঠী বা অঞ্চল তার মূল রাষ্ট্রটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডঃ এমাজউদ্দিন আহমদ এবং রাষ্ট্রের নীতি-প্রভাবক  দ্বিতীয়-সর্বোচ্চ সাবেক আমলার স্বায়ত্ত্বশাসন বিষয়ক চিন্তা ও সিদ্ধান্ত এক জায়গায় এসে মিলেছে। উল্লেখ্য যে, বহুদিন ধরে নিয়মিত কোনো যোগাযোগ না থাকলেও শেষোক্ত পররাষ্ট্র সচিব মহোদয় সস্ত্রীক আমার পূর্বপরিচিত প্রিয়জন। তাও আবার সেই ১৯৮৯ সাল থেকে, যখন তাঁরা দিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু আমার প্রিয়জন এই পররাষ্ট্র সচিব মহোদয় পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও তাঁর বয়ানকৃত ‘অধিকতর স্বায়ত্ত্বশাসন প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ়করণের’ তত্ত্বটি মানেন কিনা, তা অবশ্য এখনো জানা হয়নি।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিখাদ দেশপ্রেমিক, আলাভোলা এবং কিছুটা নির্বোধ-সরল-প্রাকৃতিক ও উস্কানি-উগ্র আদিবাসীরা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়ার প্রত্যয় ধরে রাখলেও কাশ্মীরের মুসলমানরা কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডঃ এমাজউদ্দিনের তত্ত্বকে ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা অর্জন কিংবা পাকিস্তানের সাথে অঙ্গীভূত হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে শুধু নিজের জন্য, নিজের ধর্ম-জাতি-জ্ঞাতি-ভ্রাতা-উম্মাহর জন্য বিচ্ছিন্নতার পক্ষে এমন আবেগতাড়িত, উদগ্র অভিলাষও বিশেষ ধর্ম-দর্শনজাত কোনো পাগলপারা জিহাদি নিয়ৎ বা সংকল্প কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

                     
তাহলে এখন ব্যাপারটি কী দাঁড়ালো? পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং কাশ্মীর উভয় অঞ্চলই কিন্তু এখন শান্তি, সমঝোতা, সহাবস্থান এবং বহুমাত্রিক জীবন-ব্যবস্থার জন্য উন্মুখ। একইসাথে এই দুই অঞ্চলের বাসিন্দারা বহিঃসমাজের প্রভাবমুক্ত থেকে নিজেদের জাতিগত, ধর্ম-সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্যও অক্ষুণ্ণ রাখতে চান। কিন্তু এক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কাশ্মীরের জনগণের ঐতিহাসিক এবং অধিকারগত যে পার্থক্য সেটি হলো, কাশ্মীরের মুসলমানরা ঐ অঞ্চলে বহিরাগত, যেমনটি বাঙালি সেটেলাররা পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত। আর বৌদ্ধ ও হিন্দুরা যেমন কাশ্মীরের আদি বাসিন্দা তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি আদিবাসী জুম্ম জনজাতিও (বৌদ্ধ-হিন্দু-খ্রিস্টান) এই পার্বত্যভূমির আদি বাসিন্দা। উভয় ক্ষেত্রে মুসলমান জনগোষ্ঠীই বহিরাগত এবং আগ্রাসী শাসকরূপে আবির্ভূত। শুধুমাত্র সংখ্যার জোরে কাশ্মীরি মুসলমান শাসকেরা এতোদিন কাশ্মীরি হিন্দু (পণ্ডিত) এবং লাদাখের বৌদ্ধদেরকে একপ্রকার পদপিষ্ট করে এসেছেন। মুসলমানদের তরফে এহেন অবিচার, বৈষম্য সত্ত্বেও শুধুমাত্র সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে লাদাখিরা ইসলামী শোষণের কবলমুক্ত হতে পারছিলেন না। অথচ স্বতন্ত্র ইউনিয়ন টেরিটোরির দাবিতে তাঁদের আন্দোলন দীর্ঘ প্রায় ৭০ বৎসরের। স্বতন্ত্র ইউটি পেয়ে তাঁরা এখন মহাখুশী, যা আবার মিজোরামের মিজোদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। মিজোরা রাজ্যের কয়েকটি স্থানে মোদী-শাহের এফিজিও পুড়িয়েছে। তাঁদের এই ক্ষোভের কারণ, সেখানকার চাকমারাও ইউনিয়ন টেরিটোরির দাবিতে প্রায় দুই দশক ধরে আন্দোলন করে আসছেন। এটি বোধগম্য যে, মোদী-অমিত শাহের সরকার ইতোপূর্বের ঐতিহাসিক ভুলগুলোকে শোধরানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে চাকমাদের/জুম্মদের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়লেও ছিঁড়তে পারে। এখন আমাদের দরকার বৃহত্তর জুম্ম জাতীয় সংহতি এবং বুদ্ধিদীপ্ত সঠিক কূটনীতি। তাই এদেশের বাঙালি বামদের সমতালে লাফানোর আগে নিজেদের ভবিষ্যতমুখী জাতীয় জীবনের আগুপিছু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখার জন্য জুম্ম ভ্রাতা-ভগ্নীদের কাছে অনুরোধ জানাই।

(১০) 

উপরোক্ত এতোসব বাহাস-বয়ানের পর আমি জম্মু-কাশ্মীর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য আপাতত একটিই সমাধান দেখি। সেটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পাহাড়ি, বাঙালির জন-অনুপাত ৭০:৩০ মেনে নেওয়া, যা কাশ্মীরের ক্ষেত্রে হবে ৫০:৫০। এই লক্ষ্যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও নীতিসিদ্ধান্ত প্রণয়ন জরুরি। ভারতের মোদী সরকার আগামী কয়েক বৎসরের মধ্যে তাঁদের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন বলে মনে করি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কর্ণধারগণ কি আসলে মোদীজির পদাঙ্ক অনুসরণ করে পার্বত্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইবেন? দেখুন, যেদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী একজন কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মানুষ সেদেশে তাঁর তিরোধানের মাত্র দুই দশকের মধ্যে ঐ সম্প্রদায়ের প্রায় সকলকে কাশ্মীরের মুসলমানরা সমূলে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করেছে। সেকাজে তারা একটি শত্রুদেশের সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছে। আর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই অবস্থাটিকে বিগত প্রায় সাত দশক ধরে নির্বোধের মতো মেনে নিয়েছে। ভাবা যায়? এদেশের অনেকে বলেন, কাশ্মীরে ভারতীয় সেনারা চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। সেখানে তারা কাশ্মীরি নারীদের ধর্ষণ করছে, মুসলমানদেরকে ভিটেমাটি ছাড়া করছে, ইত্যাদি। সেক্ষেত্রে তাঁরা দীর্ঘ তিন-চার দশকের লম্বা ফিরিস্তি-সমৃদ্ধ খতিয়ান দাখিল করেন। কিন্তু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের দেশে একটি বিশেষ অঞ্চলের ১ কোটি মুসলমান সাম্প্রদায়িক জীঘাংসাবশত ৫-৬ লক্ষ হিন্দু-বৌদ্ধকে নিজেদের বংশানুক্রমিক আবাসভূমি থেকে উৎখাত করবে, সেটি কি কোনো অবস্থাতেই মানা যায়? এখন আপনারাই বলুন, কে বেশি নিপীড়িত, নির্যাতিত? সেনা আক্রমণের শিকার মুসলমানরা, নাকি মুসলমানদের আক্রমণের শিকার হিন্দু পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা জনসংখ্যায় প্রায় ৫-৬ লক্ষ? আর তাঁদের নারীদেরকে কি ধর্ষণ করা হয়নি? যার জন্য আমার কলেজবন্ধু অখিলেশ এখনো ঢুকরে কেঁদে ওঠেন? কাশ্মীরি মুসলমানরা প্রকাশ্যে তাঁদের প্ল্যাকার্ডে, শ্লোগানে বলছেন, ‘ভারত তুমি কাশ্মীর ছাড়ো, আমরা মুক্তি চাই’। পার্বত্য চট্টগ্রামে এজাতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী, সাহসী শ্লোগানের উচ্চারণ কেউ শুনেছেন কি? এমন ধৃষ্টতা প্রদর্শন এদেশের শাসকগোষ্ঠীর কেউ কি সহ্য করবেন? কিন্তু ভারতে সেটিই এখনো গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে গণ্য।   

ফলে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহজির বক্তব্যই এখানে যথার্থ বলে মনে করি। তাঁর মতে, ‘সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ উঠে গেলে ভারতের সাথে কাশ্মীরের গভীর আত্তীকরণ ঘটবে। এই অনুচ্ছেদকে হাতিয়ার করেই পাকিস্তান কাশ্মীর উপত্যকায় সন্ত্রাসে উস্কানি দিয়েছে। গত তিন দশকে ৪১ হাজার মানুষের মৃত্যুর পিছনে এই অনুচ্ছেদ ৩৭০ দায়ী। আর কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ নন, রাজ্যটির তিনটি পরিবার যারা এ যাবৎ রাজত্ব করে এসেছে, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত।’

বন্ধুগণ, তাই ধর্ম, ভাবাবেগ ও জাতিগত নৈকট্যের বিচারে নয়, ঐতিহাসিক সত্য, চিরন্তন মানবতাবাদ ও বাস্তবতার কষ্টিপাথরে আমাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং কাশ্মীরের ঘটনাপ্রবাহকে বিচার করতে হবে এবং সমাধানসূত্র খুঁজতে হবে। এক্ষেত্রে বুদ্ধ তথাগতের অহিংসা, কার্যকারণ সম্পর্ক এবং মধ্যমপন্থাও আমাদেরকে সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে বুদ্ধের নিয়মানুসারে উভয় পক্ষকে কিছুটা ছাড় দিয়ে সমাধানের পথে এগোতে হবে। আর এর মূল মন্ত্রটি হলোঃ ‘লিভ এন্ড লেট লিভ’। অর্থাৎ তুমি নিজে বাঁচো এবং অন্যকেও বাঁচতে দাও। এই মন্ত্রটি আধুনিক গণতন্ত্রেরও মূল ভিত্তি, যা কাশ্মীর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উভয় অঞ্চলের সমস্যা সমাধানের জন্যই প্রযোজ্য। আর এই দুই অঞ্চলে নারী ও শিশুদের ওপর যে কোনো অত্যাচার-নিপীড়ন বিষবৎ প্রত্যাখ্যাত এবং প্রকাশ্য গণআদালতে বিচারযোগ্য হবে।

1 comment:

  1. There is no reference that you have collected information of those books. At least you must keep your mind to tail the list of the books name. Anyway informative thoug, It'sjust for your own opinion��

    ReplyDelete

বুদ্ধ পুর্ণিমা উপলক্ষে পার্বত্য জেলায় শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

চাকমা মিডিয়া ডেস্ক ১১ মে ২০২৫, রবিবার ১০ মে ২০২৫ রাঙামাটিতে শুভ বুদ্ধ পুর্ণিমা ২৫৬৯ বুদ্ধাব্দকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি...